মালয়েশীয় উপকূলে নিষেধাজ্ঞার তেল বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত জাহাজ চলাচল করিডোর

মালয়েশিয়ার উপকূলবর্তী সমুদ্র এলাকা বর্তমানে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া তেল বাণিজ্যের এক বিশাল ‘অঘোষিত কেন্দ্রে’ পরিণত হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার ‘হিউম্যানিটি’ নামক একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালী অতিক্রম করে মালয়েশিয়ার উপকূলের দিকে অগ্রসর হয় এবং এক পর্যায়ে নিজস্ব শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা এআইএস বন্ধ করে দিয়ে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য বলছে, ৩৩০ মিটার দীর্ঘ বিশাল এই ট্যাংকারটি মালয়েশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় আউটার পোর্ট লিমিটস বা ইওপিএল এলাকায় নোঙর ফেলেছে। সমুদ্রের ১ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই অঞ্চলটি উপকূল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ট্যাংকারটি তার অবস্থানে পৌঁছানোর পর গোপনে অপর কোনো জাহাজে তেল হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাধারণত এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইরানের অপরিশোধিত তেল শেষ পর্যন্ত চীনের বাজারে পৌঁছায়। ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশনের তথ্যমতে, ইরান তার মোট রফতানি করা তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই চীনে পাঠিয়ে থাকে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই ইওপিএল এলাকাটি ইরান, রাশিয়া ও ভেনিজুয়েলার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এক ধরনের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রকল্প ‘সিলাইট’-এর পরিচালক রে পাওয়েল আল জাজিরাকে জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে অন্তত ৬২টি জাহাজকে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে পারস্য উপসাগর, ইওপিএল এবং হংকং হয়ে উত্তর চীনের দিকে যেতে দেখা গেছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক এরিকা ডাউন্স বলেন, চীনের ছোট ‘টিপট’ শোধনাগারগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার আওতার বাইরে থাকায় তারা এসব বিতর্কিত ও সস্তা তেল কিনতে বেশি আগ্রহী। আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে তেলের উৎস গোপন করা হয়, যা বারবার সংঘটিত হওয়ার ফলে মূল উৎস শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ইওপিএল অঞ্চলটি মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জলসীমার বাইরে কিন্তু তাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শান্ত পানি এবং দূরবর্তী জায়গা হওয়ায় এটি অবৈধ বাণিজ্যের জন্য কৌশলগত সুবিধা দেয়। মালয়েশিয়ার মেরিটাইম এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির মতে, এলাকাটির বিশালতা এবং বিচারিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানে নজরদারি চালানো অত্যন্ত দুরূহ। তবে গত জুন মাসে কুয়ালালামপুর সরকার নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবৈধ নোঙর এবং অনুমতিহীন পণ্য স্থানান্তরের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে আইন সংশোধন করেছে।
তথ্যানুযায়ী, যেকোনো দিন এই এলাকায় প্রায় ২০০টি জাহাজ নোঙর করে থাকে, যার অর্ধেকই ইরানের সাথে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীনের ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে রেনমিনবি মুদ্রায় লেনদেন সম্পন্ন হওয়ায় ইরান ও চীনের এই তেল বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে। যদিও বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান থেকে তেল আমদানির বিষয়টি স্বীকার করে না, তবে চীনের কাস্টমস তথ্য ও মালয়েশিয়ার উৎপাদন ক্ষমতার অসামঞ্জস্যতা থেকেই এই বাণিজ্যের গভীর যোগসাজশ ফুটে ওঠে। গত বছর ইরান প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল তেল চীনে পাঠালেও চীনা শুল্ক নথিতে ইরানের নাম ছিল না, যা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে মালয়েশিয়ার মাধ্যমে আসা অতিরিক্ত তেল মূলত ইরানি।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
