ইসরায়েলের বর্ণবাদ তুলনা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধানের সঙ্গে তেল আবিবের কূটনৈতিক দূরত্ব সৃষ্টি

ইসরায়েলি ভূখণ্ড ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি দেশটির আচরণকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করার অভিযোগ ওঠায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাসের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার। এই কূটনৈতিক সংকটের সূত্রপাত হয় ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ইউরাকটিভের একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে, যেখানে দাবি করা হয় যে, মে মাসে মেক্সিকোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ব্যক্তিগত আলোচনায় কালাস গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নীতিকে বর্ণবৈষম্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

বিজ্ঞাপন

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, কালাস যতক্ষণ পর্যন্ত এই ‘রক্তের অপবাদ’ প্রত্যাহার না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা হবে না। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় কালাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান ও সংলাপের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলেও, গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে আসা মন্তব্য অস্বীকার করার কোনো প্রচেষ্টা চালাননি। সারের ভাষ্যমতে, কালাসের এই নীরবতাই তাঁর অবস্থানের সত্যতা প্রমাণ করে।

এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা এমন এক সময়ে তৈরি হলো যখন ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর বিশ্লেষক নেলে অ্যান্ডারস আল-জাজিরাকে জানান, এই ঘটনাটি ইইউ-এর অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন। তাঁর মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি এখন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ এবং ইউরোপীয় কমিশনের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছে, যার ফলে ইইউ-এর সামগ্রিক অবস্থান অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।

আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিহাল মার্টিন এই পরিস্থিতির সমালোচনা করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষ্ক্রিয়তাকে ব্লকের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি সার কর্তৃক কালাসের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। আয়ারল্যান্ড, স্পেন ও স্লোভেনিয়ার মতো দেশগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ ও সম্পর্ক পর্যালোচনার দাবি তুললেও জার্মানি, ইতালি, হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্রের বিরোধিতার কারণে তা এখনো কার্যকর হয়নি।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য যে, ১৯৯৫ সালে স্বাক্ষরিত ইইউ-ইসরায়েল অ্যাসোসিয়েশন এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলের বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই চুক্তি স্থগিতের আহ্বান জানালেও, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে জার্মানি ও অন্যান্য প্রভাবশালীর বিরোধিতায় এই চুক্তি বাতিল বা বড় কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ইইউ-এর নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক প্রভাষক ফেলিক্স বেরেনস্কোটার মনে করেন, সার ও কালাসের এই বিরোধ কোনো গভীর সংকটের পূর্বাভাস নয়, বরং এটি ইসরায়েলের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। ইসরায়েল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে যাতে ইইউ-এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা যায়। কূটনৈতিজ্ঞদের মতে, এই বিতর্ক ইইউ-এর পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ক্ষমতার লড়াইয়ের একটি অংশমাত্র, যেখানে ইসরায়েল নিজের সুবিধার্থে পরিস্থিতিকে ব্যবহার করছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%