হান্টাভাইরাস আক্রান্ত প্রমোদতরীকে ক্যানারি দ্বীপে নোঙরের অনুমতি দিল স্পেন

কেপ ভার্দের উপকূলে নোঙর করা একটি বিলাসবহুল প্রমোদতরীতে হান্টাভাইরাসের প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাবের পর ডাচ দম্পতি ও এক জার্মান নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এপ্রিল মাস থেকে এই সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন প্রমোদতরী ‘এমভি হনডিয়াস’-এর দুইজন ক্রু সদস্য, যাদের জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে স্পেন জাহাজটিকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। কারণ, পশ্চিম আফ্রিকার দেশ কেপ ভার্দের পক্ষে জাহাজের ১৪৭ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্যকে চিকিৎসা সহায়তা প্রদান সম্ভব নয় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে।
মঙ্গলবার স্পেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায় যে, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জেই আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার মতো সক্ষমতা রয়েছে এবং ভৌগোলিকভাবে এটি নিকটতম স্থান। মন্ত্রণালয় আরও উল্লেখ করে, এই মানুষদের সহায়তা করা স্পেনের নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা, কারণ তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন স্পেনীয় নাগরিকও রয়েছেন।
ডাচ সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের পর স্পেন, জাহাজের গুরুতর অসুস্থ একজন ডাচ নাগরিক চিকিৎসককে চিকিৎসা ফ্লাইটে গ্রহণ করবে। ওশেনওয়াইড এক্সপেডিশনস, ডাচ পতাকাবাহী এই জাহাজের অপারেটর, জানিয়েছে যে, দুইজন ক্রু সদস্যের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন। জাহাজে থাকা অন্য একজন সন্দেহভাজন রোগীর ক্ষেত্রে কেবল হালকা জ্বরের লক্ষণ দেখা গেছে। এর আগে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া একজন ব্রিটিশ নাগরিক দক্ষিণ আফ্রিকার একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যায় রয়েছেন।
স্পেনীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, যাদের জরুরিভাবে জাহাজ থেকে নামানোর প্রয়োজন, তাদের সরিয়ে নেওয়ার পরেই ‘এমভি হনডিয়াস’ ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করবে। ওশেনওয়াইড এক্সপেডিশনস জানিয়েছে, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছাতে তিন দিন সময় লাগবে এবং জাহাজটি গ্রান ক্যানারিয়া অথবা টেনেরিফে নোঙর করবে।
যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছালে তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা এবং নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। স্পেনীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং ডব্লিউএইচও-এর সমন্বয়ে এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ এড়াতে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় বিশেষ সুবিধা ও পরিবহনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
হান্টাভাইরাস একটি বিরল রোগ, যা সাধারণত আক্রান্ত ইঁদুরের মূত্র, বিষ্ঠা ও লালার মাধ্যমে ছড়ায়। ডব্লিউএইচও-এর মতে, এপ্রিলের ১ তারিখে আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে কেপ ভার্দের উদ্দেশে যাত্রা করা এই প্রমোদতরীতে ২৩টি দেশের ৮৮ জন যাত্রী ও ৫৯ জন ক্রু সদস্য ছিলেন। ডব্লিউএইচও-এর একজন কর্মকর্তা মঙ্গলবার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, জাহাজে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে মানব-থেকে-মানবে সংক্রমণ ঘটে থাকতে পারে।
তবে ডব্লিউএইচও আবারও উল্লেখ করেছে যে, মানব-থেকে-মানবে সংক্রমণ বিরল এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকির মাত্রা কম। তারা আরও জানিয়েছে, জাহাজটিতে কোনো ইঁদুর নেই বলে তাদের অবহিত করা হয়েছে। এই ভাইরাসের অ্যান্ডিস স্ট্রেনের পূর্ববর্তী কিছু প্রাদুর্ভাবে দক্ষিণ আমেরিকা, বিশেষ করে আর্জেন্টিনায় ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে সীমিত বিস্তার দেখা গেছে। ডব্লিউএইচও মনে করে, হান্টাভাইরাসের সুপ্তিকাল সাধারণত এক থেকে ছয় সপ্তাহ হয়, তাই ডাচ দম্পতি জাহাজে ওঠার আগে আর্জেন্টিনায় ভ্রমণের সময়ই আক্রান্ত হয়েছিলেন। পাখিদর্শন ভ্রমণে থাকা অবস্থায়ও কিছু যাত্রী আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, কারণ এসব দ্বীপে পাখি ও ইঁদুর উভয়ই বসবাস করে এবং এই ধরনের ভ্রমণ ক্রুজের প্যাকেজের অংশ ছিল।
মার্চ মাসের শেষের দিকে আর্জেন্টিনার দক্ষিণাঞ্চল থেকে যাত্রা শুরু করা এই বিলাসবহুল ক্রুজে মূলত ব্রিটিশ, আমেরিকান ও স্পেনীয় যাত্রী ছিলেন। এটি অ্যান্টার্কটিক প্রকৃতি অভিযান হিসেবে বাজারজাত করা হয়েছিল, যার প্রতি বার্থের মূল্য ছিল ১৪,০০০ থেকে ২২,০০০ ইউরো (১৬,০০০ থেকে ২৫,০০০ ডলার)। এই অভিযানে অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপ, সাউথ জর্জিয়া এবং পৃথিবীর কিছু প্রত্যন্ত দ্বীপ যেমন ট্রিস্তান দা কুনহা পরিদর্শন করা হয়।
প্রথম ডাচ যাত্রী, যিনি পুরুষ, এপ্রিলের ১১ তারিখে মারা যান। ওশেনওয়াইড এক্সপেডিশনস জানিয়েছে, তার দেহ এপ্রিলের ২৪ তারিখ পর্যন্ত জাহাজে ছিল এবং পরে সেন্ট হেলেনায় নামানো হয়। তার স্ত্রী মৃতদেহ প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা করেন। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, তার স্ত্রীকে জাহাজ থেকে নামানোর সময় তার গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল উপসর্গ ছিল এবং জোহানেসবার্গে ফ্লাইট চলাকালে তার অবস্থার অবনতি হয়। এপ্রিলের ২৬ তারিখে জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পরই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ফ্লাইটের যাত্রীদের জন্য কন্টাক্ট ট্রেসিং চলছে। দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃপক্ষ জোহানেসবার্গের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্রিটিশ রোগীর হান্টাভাইরাস পজিটিভ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা