টাঙ্গাইলে প্লাস্টিকের আগ্রাসনে অস্তিত্ব সঙ্কটে ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেতশিল্প

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার শালগজারিবেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা বনাঞ্চলের জনপদ এখন ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেতশিল্পের দুর্দিন পার করছে। এক সময়ে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নিবিড় অংশ ছিল হাতে তৈরি বাঁশের নানা পণ্য। এসব হস্তশিল্পকে উপজীব্য করে গ্রামীণ জনপদের বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং সচ্ছলতা আনতেন সংসারে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এবং প্লাস্টিক পণ্যের সহজলভ্যতার কারণে বাজার দখল হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্দিনে পড়েছেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগর ও শিল্পীরা।

মধুপুর একটি আদিবাসী সমৃদ্ধ অঞ্চল। এখানকার নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে গারো সম্প্রদায় এবং কোচ ও বর্মন সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলের নারীরাই পরিবারের মূল দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তারা গৃহস্থালি ও চাষাবাদের পাশাপাশি নিপুণ হাতে তৈরি করে চলেছেন বাঁশের শৌখিন ও বাহারি কুটির শিল্পপণ্য। দোখলা, পীরগাছা ও বর্মনপাড়ার নারীরা আজও তাদের এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

মধুপুর উপজেলার ফুলবাগচালা ইউনিয়নের পীরগাছা গ্রামের অধিবাসীদের একটি বড় অংশ কোচ ও বর্মন সম্প্রদায়ের। এখানকার নারীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় এখনো তৈরি হচ্ছে হাতপাখা, কলমদানি, প্রিন্ট ট্রে, পেন হোল্ডার, পানি রাখার জগ, ফুলদানি, টি-টেবিল ও ঝুড়ির মতো নানা প্রয়োজনীয় জিনিস। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকার ও ক্রেতারা এসে এসব পণ্য কিনে নিয়ে যান। তবে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে তারা বাঁশের কাজকে আঁকড়ে ধরে আছেন।

বর্তমান সময়ে বাঁশের আকাশচুম্বী দাম বৃদ্ধি এবং প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক চাহিদার কারণে এই কুটির শিল্পটি আজ ধুঁকে ধুঁকে টিকে রয়েছে। স্থানীয় কারিগর রাধা রানি জানান, তাদের গ্রামের প্রায় দুই হাজার ৩৫০ ঘরের নারীরা কমবেশি বাঁশের কাজ করেন। অপর কারিগর রূপালী রানি বর্মন বিগত ১৫ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও জানিয়েছেন যে, উপযুক্ত মূল্য ও কদর না থাকায় অনেকেই এখন পৈত্রিক এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

মূলত পর্যাপ্ত পুঁজির অভাব, কাঁচামালের চড়া মূল্য, সঠিক উদ্যোক্তার সংকট এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে এই শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং সাপ্তাহিক কিস্তির চাপে হিমশিম খাচ্ছেন। স্থানীয় উদ্যোক্তা লিটন নকরেক এবং কারিগর সঞ্চিতা রানি ও টোটন বর্মনের মতো প্রান্তিক মানুষরা কায়িক পরিশ্রম করেও অভাব অনটন থেকে মুক্ত হতে পারছেন না। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং কারিগরদের জীবনে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে তাঁরা অবিলম্বে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতা ও সুদমুক্ত ঋণের দাবি জানিয়েছেন।

০%
০%
০%
০%