চট্টগ্রামে হামে আক্রান্ত শিশুদের ৮৫ শতাংশই টিকাবিহীন, গবেষণায় উঠে এল অপুষ্টি ও সচেতনতার অভাবের চিত্র

চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিভাগে তিনশ জন শিশুকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়। গবেষণায় হামে আক্রান্ত শিশুদের শারীরিক জটিলতা, অপুষ্টি এবং টিকাবিহীন থাকার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের দুই মাস থেকে ১১ বছর বয়সী তিনশ জন হাম আক্রান্ত শিশুর ওপর এই গবেষণা পরিচালিত হয়, যাতে আর্থিক ও সার্বিক সহায়তা প্রদান করে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য হিসেবে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৮৫.২ শতাংশই ছিল সম্পূর্ণ টিকাবিহীন। টিকাবিহীন এই শিশুদের ক্ষেত্রে ৫২ শতাংশ অভিভাবকের অসচেতনতা বা টিকার নির্দিষ্ট তারিখ ভুলে যাওয়াকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া গত ছয় মাসে মাত্র ৩২.১ শতাংশ শিশু ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেয়েছিল, এবং যারা এই ক্যাপসুল পায়নি তাদের মধ্যে ৫৯ শতাংশই গুরুতর জটিলতার শিকার হয়েছে।

আক্রান্ত শিশুদের বয়স ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের ১১ শতাংশের বয়স ছয় মাসের নিচে, ২৩.৫ শতাংশের বয়স এক থেকে পাঁচ বছর এবং ৪৬ শতাংশ শিশুর বয়স ছিল নয় মাসের কম, যা নির্দেশ করে যে তারা নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি, আক্রান্ত শিশুদের এক-তৃতীয়াংশ বা ৩১ শতাংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল, যা হামের মারাত্মক জটিলতায় পড়ার অন্যতম বড় ঝুঁকি। এই শিশুদের মধ্যে ৭৫.৫ শতাংশই গ্রামীণ এলাকার এবং ৬৪.৮ শতাংশ ছিল নিম্ন আর্থ-সামাজিক পরিবারের সন্তান। সংক্রমণ বিশ্লেষণে আরও জানা যায়, ৫৯.৪ শতাংশ শিশু বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে, যা হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা ফুটিয়ে তোলে। এছাড়া ১৮.৯ শতাংশ শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো হয়নি। গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক দিক ছিল জিনোম সিকোয়েন্সিং পরীক্ষায় শতভাগ নমুনায় ‘বি৩ জেনোটাইপ’ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়া।

গবেষণা প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন যে হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ এবং এতে কোনো শিশুর মৃত্যু গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি টিকার কভারেজ পঁচানব্বই শতাংশে উন্নীত করা, অপুষ্টি দূর করা, প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা এবং হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও জোরদার করার কড়া নির্দেশ দেন।

এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান গোলাম বাকি মাসুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. মো. জসিম উদ্দিনসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও গবেষকেরা। সভাপতির বক্তব্যে গোলাম বাকি মাসুদ বলেন যে এই গবেষণাকে কেবল বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর উপাত্তগুলোকে বাস্তবভিত্তিক জনস্বাস্থ্য উদ্যোগে রূপান্তর করতে হবে, কারণ গবেষণার মূল উদ্দেশ্য তথ্য তৈরি করা নয়, বরং শিশুদের জীবন বাঁচানো।

০%
০%
০%
০%