তরুণদের ২০ লাখ টাকা অর্থায়ন, আবেদন করবেন যেভাবে

তরুণদের সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও বেগবান করার লক্ষ্যে একটি নতুন অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ’ নামের এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় দেশের নির্বাচিত সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তারা কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ কুড়ি লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

এই সমন্বিত অর্থায়নের অর্ধেক অংশ ব্যাংকঋণ এবং বাকি অর্ধেক অংশ অনুদান হিসেবে দেওয়ার সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, সর্বোচ্চ কুড়ি লাখ টাকা অর্থায়নের ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান লাভ করতে পারবেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা সম্ভাবনাময় তরুণদের চিহ্নিত করে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়াতে এই যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট গত ১৩ সেপ্টেম্বর ‘উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি-উদ্যোগ’-এর বিস্তারিত নীতিমালা প্রকাশ করে। পরবর্তীতে এই নীতিমালা দেশের সকল তফশিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী মোট পাঁচ হাজার সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাকে খুঁজে বের করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে এই কর্মসূচির আবেদন গ্রহণ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত আবেদনপত্র জমা দেওয়া যাবে। এছাড়া দেশের অন্যান্য জেলার অন্তর্ভুক্ত উপজেলার উদ্যোক্তারা আগামী ১ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদন করার সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, এসএমই পোর্টাল এবং দেশের সব তফশিলি ব্যাংকের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে নির্ধারিত আবেদন ফরম সংগ্রহ করা যাবে। যথাযথভাবে ফরম পূরণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমেই তা জমা দিতে হবে।

আবেদন করার জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলায় অবস্থিত যেকোনো তফশিলি ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করতে হবে। তবে যে ব্যাংকে আবেদন করা হবে, সেখানে আগে থেকেই কোনো ব্যাংক হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। আবেদনকারীর স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কমিশনার বা কাউন্সিলরের দেওয়া নাগরিক সনদ কিংবা প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে। এর পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদের অনুলিপি, সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের অনুলিপি, দক্ষতা উন্নয়ন বা উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের সনদ থাকলে তার অনুলিপি এবং নাগরিক সনদ আবশ্যকভাবে সংযুক্ত করতে হবে।

উদ্যোক্তা অনুসন্ধান ও আবেদনপত্র গ্রহণের যাবতীয় দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তফশিলি ব্যাংকগুলোর শাখাগুলোর ওপর ন্যস্ত থাকবে। প্রতিটি উপজেলার তফশিলি ব্যাংক শাখাগুলোর মধ্য থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট ব্যাংককে লিড ব্যাংক হিসেবে নির্ধারণ করবে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার আবেদনগুলো উপজেলা লিড ব্যাংকের মাধ্যমে এবং জেলার আবেদনগুলো জেলা লিড ব্যাংকের মাধ্যমে সার্বিকভাবে সমন্বয় করা হবে।

তবে প্রাথমিক পর্যায়ে নির্বাচিত হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। চূড়ান্তভাবে মনোনীত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজস্ব ঋণনীতি ও প্রচলিত বিধিবিধান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কোনো উদ্যোক্তার ঋণের আবেদন বাতিল হলে তার সুনির্দিষ্ট কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করে তা অবিলম্বে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে হবে।

আবেদনকারীর ব্যবসার ধরন, সম্ভাব্যতা এবং প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করেই অর্থায়নের চূড়ান্ত অংক নির্ধারণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার প্রকৃত ব্যবসায়িক চাহিদা এবং প্রস্তাবিত ব্যয় গভীরভাবে বিবেচনা করা হবে। একজন নির্বাচিত উদ্যোক্তার ব্যবসার জন্য সর্বোচ্চ কুড়ি লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়নের সুযোগ থাকলেও সবাই সমভাবে সর্বোচ্চ এই পরিমাণ অর্থ পাবেন না। নীতিমালায় উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো উদ্যোক্তার ব্যবসায় যদি ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন হয়, তবে তিনি নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ছয় লাখ টাকা ঋণ এবং ছয় লাখ টাকা অনুদান পেতে পারেন। উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ বা অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থ থাকলেও তা সামগ্রিক অর্থায়ন পরিকল্পনার সময় বিবেচনায় রাখা হবে।

‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির আওতায় কেবল আর্থিক সহায়তা দেওয়াই নয়, বরং ব্যবসা সফলভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ধরনের কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রতিটি আবেদনকারীকে আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। এর পাশাপাশি নির্বাচিত উদ্যোক্তারা পেশ প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ মেন্টরের মূল্যবান পরামর্শ, ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএনসহ ব্যবসা নিবন্ধনে সার্বিক সহায়তা, সুনির্দিষ্ট বিজনেস প্ল্যান তৈরির সহযোগিতা এবং বাজার সংযোগ স্থাপনের সুবর্ণ সুযোগ লাভ করবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাময় তরুণদের ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের প্রকৃত অর্থে স্বাবলম্বী করে তোলা সম্ভব হবে। কর্মসূচির কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পেতে কোনো পর্যায়ে কোনো ধরনের তদবির বা সুপারিশ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তদবিরের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীর প্রার্থিতা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের সঠিক পরিচয় যাচাই, সিআইবি প্রতিবেদন এবং লেনদেন নিবিড়ভাবে তদারকি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান সকল নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা এই বিশেষ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে।

০%
০%
০%
০%