ঘরটি আর নিজের জায়গায় নেই। উঠানের মাটি, পাশের গাছ, পরিচিত পথ—সবকিছুই যেন ধীরে ধীরে নদীর দিকে সরে যাচ্ছে। তাই কেউ ঘরের টিন খুলছেন, কেউ আসবাবপত্র সরাচ্ছেন, কেউ শেষবারের মতো নিজের বসতভিটার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আজ যে ঘর সরিয়ে নিচ্ছেন, আগামীকাল সেটি কোথায় দাঁড় করাবেন?
শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মার পাড়ের মানুষের কাছে বর্ষা এখন শুধু বৃষ্টির মৌসুম নয়; এটি ঘর হারানোর শঙ্কারও সময়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পালেরচর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন নতুন করে তীব্র হয়েছে। ভাঙনে বসতবাড়ি, দোকান ও সড়কের অংশ নদীগর্ভে চলে যাওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিতে পড়েছে আরও বহু পরিবার। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রায় ৫০০ পরিবারকে ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকার কথা বলা হয়েছে।
পদ্মার তীব্র স্রোত নদীতীরের মাটিকে কেটে নিচ্ছে। কোথাও গতকালও যে জায়গায় মানুষের বসত ছিল, আজ সেখানে নদীর পানি। কোথাও আবার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ বুঝতে পারছেন—আর কত দিন এই জায়গায় থাকা যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
জাজিরার পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া, মোহন ফকিরের কান্দি ও মধু ব্যাপারীকান্দিসহ নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের চাপ সবচেয়ে বেশি। আগস্টের শেষ দিকে প্রকাশিত সরেজমিন প্রতিবেদনে সাতটি দোকানঘর নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার কথা উঠে আসে। অর্ধশতাধিক মানুষ তখনই ভাঙনের আশঙ্কায় ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছিলেন। নদীতীরের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
এ ভাঙনের সবচেয়ে নির্মম দিকটি হলো—মানুষকে অনেক সময় নিজের ঘর নিজেকেই ভেঙে ফেলতে হয়।
বছরের পর বছর যে ঘরটি পরিবারের নিরাপদ আশ্রয় ছিল, সেটিই যখন নদীর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন সেটিকে রক্ষা করার আর কোনো উপায় থাকে না। ঘরের টিন, কাঠ, দরজা-জানালা, আসবাব—যা কিছু খুলে নেওয়া সম্ভব, মানুষ সেগুলো নিয়ে অন্যত্র চলে যান। সঙ্গে নেওয়া যায় না শুধু সেই উঠান, সেই মাটি, সেই স্মৃতি।
৮২ বছর বয়সী মালেক ঘরামীর ক্ষেত্রেও এমনই হয়েছে। তাঁর ২৮ শতাংশ জমির মধ্যে ২৪ শতাংশই পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। শেষ সম্বল বসতঘরটিও সরিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন—“কোথায় যাব”—আসলে শুধু একজন বৃদ্ধের প্রশ্ন নয়; এটি নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আরেক বাসিন্দা সোলেম শরীফের নিজের হাতে গড়া ঘরও নদীর হুমকিতে। সন্তানদের নিয়ে যে ঘরটিতে সংসার গড়ে উঠেছিল, সেটি চোখের সামনে খুলে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বাস্তবতা একজন মানুষের জন্য কতটা কঠিন, তা পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো যায় না।
ভাঙনের সঙ্গে বসবাস
জাজিরার মানুষের জন্য নদী নতুন কোনো আতঙ্ক নয়। বছরের পর বছর ধরে পদ্মার গতিপথ, স্রোত আর ভাঙনের সঙ্গে তাদের বসবাস। ২০২৫ সালেও জাজিরার বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের ভাঙনে দোকান ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছিল। তখনও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপনের কথা জানিয়েছিলেন।
অর্থাৎ এবারের সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নদীভাঙন এখানে একটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা। একবার ঘর হারানো পরিবার আবার নতুন জায়গায় ঘর তোলে। তারপর কয়েক বছর পর সেই নতুন ঠিকানাও যদি নদীর সামনে পড়ে, শুরু হয় একই গল্প—ঘর খোলা, মালামাল সরানো, নতুন জায়গা খোঁজা।
এই চক্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু বসতভিটা হারানো নয়। নদীর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবিকা, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা ও সামাজিক সম্পর্কও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সাম্প্রতিক ভাঙনে পালেরচর থেকে মাঝিরঘাট পর্যন্ত ইটের সড়কের বড় অংশ নদীগর্ভে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে। বিদ্যুতের খুঁটিও সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে। অর্থাৎ নদী যখন এগিয়ে আসে, তখন শুধু একটি বাড়ি নয়—একটি জনপদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই পিছিয়ে যেতে থাকে।
প্রতিরোধ চলছে, কিন্তু আতঙ্ক কাটছে না
ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলছে। কিন্তু পদ্মার তীব্র স্রোতের কাছে এসব প্রতিরোধব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েই স্থানীয়দের উদ্বেগ রয়েছে।
জাজিরার পদ্মার ডান তীর রক্ষায় প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি ৩৯টি প্যাকেজে বাস্তবায়নের কথা এবং আগস্টের প্রতিবেদনে কাজের প্রায় ৫৩ শতাংশ শেষ হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছিল।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভাষ্য, পদ্মার তীব্র স্রোতের কারণেই নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে এবং প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ভাঙনের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।
কিন্তু নদীভাঙনের শিকার মানুষের কাছে প্রকল্প শেষ হওয়ার ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতির চেয়ে আজকের নিরাপত্তাটাই বড়।
কারণ নদী অপেক্ষা করে না।
আজ যে জায়গাটি নিরাপদ, কয়েক দিন পর সেটিই হয়তো নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকবে। আর যে পরিবার আজ ঘর সরিয়ে নিচ্ছে, তাদের কাছে প্রতিটি দিনই হয়ে উঠছে নতুন করে বেঁচে থাকার হিসাব।
নদীর পাড়ে ভবিষ্যতের প্রশ্ন
জাজিরার ভাঙনপাড়ে দাঁড়ালে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে অনিশ্চয়তা। কেউ মালামাল সরাচ্ছেন, কেউ নতুন জায়গায় ঘর তোলার চিন্তা করছেন, কেউ আবার নদীর দিকে তাকিয়ে হিসাব করছেন—আর কতটা জমি অবশিষ্ট আছে।
কিন্তু নদীভাঙনের হিসাব শুধু জমির পরিমাণ দিয়ে হয় না।
একটি পরিবার যখন বসতভিটা হারায়, তখন তাদের হারাতে হয় নিরাপত্তা। শিশুর স্কুলে যাওয়া অনিশ্চিত হয়, ব্যবসার জায়গা বদলে যায়, কৃষিজমি হারিয়ে যায়, প্রতিবেশী ছড়িয়ে পড়ে। কখনো কখনো একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয় এক বর্ষাতেই নদীর পানিতে মিশে যায়।
জাজিরার মানুষ তাই শুধু ভাঙন ঠেকানোর দাবি করছেন না; তারা চান এমন একটি স্থায়ী ব্যবস্থা, যাতে প্রতিবছর ঘর সরানোর ভয় নিয়ে তাদের জীবন কাটাতে না হয়। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির মধ্যে রয়েছে স্থায়ী নদীতীর রক্ষা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন।
পদ্মা এখানে একই সঙ্গে জীবন ও জীবিকার উৎস। এই নদীর পানি, মাছ, পলি আর বিস্তীর্ণ চরকে ঘিরেই বহু মানুষের জীবন। কিন্তু সেই নদী যখন তীর ভাঙতে শুরু করে, তখন একই নদী হয়ে ওঠে আতঙ্কের নাম।
জাজিরার নদীপাড়ের মানুষের গল্প তাই কেবল একটি নদীভাঙনের গল্প নয়। এটি একটি ঠিকানা আঁকড়ে ধরে থাকার গল্প—বারবার ঘর হারিয়েও নতুন করে ঘর বাঁধার গল্প।
আজ তারা ঘর সরিয়ে নিচ্ছেন।
কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া ঘর সরানোর আরেকটি দিন যেন না আসে।