দুই পাড়ে পাকা সড়ক। এক পাশে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট, অন্য পাশে বরিশালের মুলাদী। মাঝখানে মাত্র প্রায় দুই কিলোমিটার জলপথ। অথচ এই ছোট্ট নদীপথই যেন দুই জেলার মানুষের জন্য বড় এক দূরত্বের নাম।
জয়ন্তী নদী পার হতে এখনো ভরসা ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ট্রলার। নদী পেরিয়ে তবেই শুরু হয় সড়কপথের যাত্রা। বর্ষা কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় সেই পারাপার হয়ে ওঠে আরও অনিশ্চিত। আর রোগী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী কিংবা ঢাকামুখী যাত্রীর জন্য এই সামান্য নদীপথই কখনো কখনো বাড়িয়ে দেয় সময়, খরচ ও দুর্ভোগ।
শরীয়তপুরের গোসাইরহাট এবং বরিশালের মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ—এই চার উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, জয়ন্তী নদীর ওপর একটি সেতু। দাবি নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে নদীর দুই পাড়ের মানুষ সেতুর আশায় আছেন। কিন্তু এখনো তাঁদের যাতায়াতের প্রধান ভরসা নৌযানই।
সম্প্রতি নদীর দুই পাড়ের ঘাট এলাকায় মানুষের চলাচল ও পারাপারের চিত্রে সেই বাস্তবতাই দেখা গেছে। মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের অনেক মানুষ শরীয়তপুর হয়ে ঢাকায় যাতায়াত করেন। তাঁদের আগে ট্রলার বা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় জয়ন্তী নদী পার হয়ে গোসাইরহাটে আসতে হয়। এরপর সড়কপথে শরীয়তপুর শহরে গিয়ে ধরতে হয় ঢাকাগামী বাস। অর্থাৎ সড়ক আছে, গন্তব্যে যাওয়ার পথও আছে—শুধু মাঝখানের নদীটুকুর ওপর নেই একটি স্থায়ী সংযোগ।
এই পথের সবচেয়ে বড় ভোগান্তি বোঝা যায় অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে। স্বাভাবিক সময়ে নৌকায় নদী পার হওয়া হয়তো কেবল বাড়তি সময়ের বিষয়। কিন্তু জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সেই সময়টুকুও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীর পানি, আবহাওয়া ও নৌযানের ওপর নির্ভর করেই তখন ঠিক করতে হয় কখন এবং কীভাবে পার হওয়া যাবে।
জয়ন্তীর দুই পাড়ের মানুষের জন্য নদীটি শুধু একটি জলধারা নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনের একটি অংশ। ভোরে কেউ বাজারে যাচ্ছেন, কেউ চিকিৎসার জন্য বের হচ্ছেন, কেউ ব্যবসার কাজে, কেউবা দূরের শহরে। তাঁদের প্রত্যেকের যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি নৌযাত্রা।
মুলাদী সদর থেকে গোসাইরহাট উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। কিন্তু নদীর ওপর সেতু না থাকায় সরাসরি সড়ক যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। অথচ নদীর দুই প্রান্তেই রয়েছে পাকা সড়ক। অর্থাৎ অবকাঠামোর দুই প্রান্ত প্রস্তুত, মাঝখানে পড়ে আছে শুধু একটি জলপথ। এই একটি সংযোগ তৈরি হলে শুধু স্থানীয় যাতায়াতই সহজ হবে না, বদলে যেতে পারে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক যোগাযোগও।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেতুটি নির্মিত হলে শরীয়তপুর জেলা শহর থেকে বরিশাল জেলা শহরের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার কমবে। গোসাইরহাট থেকে বরিশাল সদরের দূরত্ব কমবে প্রায় ৩০ কিলোমিটার। মুলাদী থেকে শরীয়তপুরের দূরত্ব কমবে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। এমনকি ঢাকা-বরিশাল সড়ক যোগাযোগের দূরত্বও প্রায় ৩৫ কিলোমিটার কমে আসতে পারে।
অর্থাৎ যে নদী আজ মানুষের পথ আটকে রেখেছে, সেই নদীর ওপর একটি সেতুই আবার চার উপজেলার মানুষের পথকে ছোট করে দিতে পারে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে কৃষি ও স্থানীয় ব্যবসায়।
মুলাদী ও আশপাশের এলাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য দ্রুত বড় বাজারে পৌঁছাতে না পারায় কৃষকদের অনেক সময় স্থানীয় বাজারেই পণ্য বিক্রি করতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, সময় লাগে এবং অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্যের প্রত্যাশিত দামও পাওয়া যায় না। সেতু হলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে, বাজারের পরিধি বাড়বে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় কৃষকদের।
একই বাস্তবতা মাছ ব্যবসা ও অন্যান্য স্থানীয় পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নদীর দুই পাড়ের মানুষের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহুদিনের হলেও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সেই সম্পর্ককে পূর্ণাঙ্গ সড়ক যোগাযোগে পরিণত হতে দিচ্ছে না।
তবে জয়ন্তী নদীতে সেতুর প্রয়োজনীয়তা নতুন করে আলোচনায় আসার পেছনে শুধু মানুষের দুর্ভোগ নয়, পুরোনো একটি অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
২০১৫ সালে আবুপুরা-মৃধারহাট নৌপথে ফেরি সার্ভিস চালু হয়েছিল। কিন্তু প্রায় দুই বছর পর সেই ফেরি সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ওই পথে বাস চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে নদীর দুই পাড়ের মানুষ আবারও নৌযানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এখন তাই স্থানীয় মানুষের কাছে সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়—এটি একটি স্থায়ী সমাধানের প্রতীক।
সেতুর জন্য প্রকল্প প্রস্তাবও এগিয়েছে। এলজিইডির মুলাদী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জয়ন্তী নদীর মৃধারহাট-ভেদুরিয়া এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৪৮০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের প্রস্তাব সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের কথা রয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাব এগোলেও নদীর দুই পাড়ের মানুষের অপেক্ষা শেষ হয়নি।
কারণ তাঁদের কাছে উন্নয়ন মানে কাগজে একটি প্রকল্পের নাম নয়। উন্নয়ন মানে হলো—রোগী নিয়ে নদীর ঘাটে এসে নৌকার অপেক্ষা করতে না হওয়া; কৃষকের পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো; একজন শিক্ষার্থীর নির্বিঘ্নে যাতায়াত; একজন ব্যবসায়ীর সময় ও পরিবহন খরচ কমে যাওয়া; কিংবা একজন প্রবাসীর পরিবারের কাছে বাড়ি ফেরার পথ সহজ হওয়া।
একজন মানুষকে গোসাইরহাট থেকে বরিশাল যেতে যদি আগে নদী পার হতে হয়, তারপর সড়কপথে দীর্ঘ যাত্রা করতে হয়, তাহলে মানচিত্রে দূরত্ব যতটা, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে ওঠে। আবার বরিশালের মুলাদী, হিজলা কিংবা মেহেন্দীগঞ্জের কোনো মানুষ শরীয়তপুর হয়ে ঢাকায় যেতে চাইলে তাঁর যাত্রাতেও যুক্ত হয় সেই নদীপথ।
এই বাস্তবতায় জয়ন্তী নদীর দুই পাড় যেন একই অঞ্চলের হয়েও আলাদা দুই জগত। এক পাড়ে সড়ক শেষ হয় ঘাটে। অন্য পাড়ে আবার সড়ক শুরু হয় ঘাট থেকে। মাঝখানে মানুষ নৌকায় ওঠেন। নদী পেরিয়ে আবার নামেন। তারপর শুরু হয় সড়কের যাত্রা।
এই যাত্রা হয়তো কয়েক কিলোমিটারের। কিন্তু প্রতিদিন যাঁরা এই পথে চলেন, তাঁদের কাছে এটি সময়, অর্থ ও অনিশ্চয়তার দীর্ঘ হিসাব।
জয়ন্তী নদীর ওপর একটি সেতু হলে সেই হিসাব বদলে যেতে পারে। গোসাইরহাটের সঙ্গে বরিশালের যোগাযোগ আরও সরাসরি হবে। মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের মানুষের শরীয়তপুর ও ঢাকামুখী যাত্রা সহজ হবে। কৃষিপণ্য ও মাছ দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে পারবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শরীয়তপুর ও বরিশালের মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগও আরও শক্তিশালী হবে।
কিন্তু সেই পরিবর্তনের আগে এখনো একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে—কবে শুরু হবে সেতুর কাজ? নদীর দুই পাড়ের মানুষ সেই উত্তর জানেন না। তাঁরা শুধু জানেন, প্রতিদিন তাঁদের নদী পার হতে হয়। জানেন, দুই কিলোমিটার জলপথ তাঁদের বহু বছরের দুর্ভোগের কারণ। আর জানেন, নদীটির ওপর একটি সেতু হলে শুধু দুই পাড় যুক্ত হবে না—যুক্ত হবে চার উপজেলার মানুষের জীবন, বাজার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সম্ভাবনার পথও। তাই জয়ন্তী নদীর ওপর সেতুর দাবি আসলে শুধু একটি সেতুর দাবি নয়। এটি একটি সহজ যাত্রার দাবি। একটি কম দূরত্বের দাবি। আর সবচেয়ে বড় কথা—একটি নদীকে বাধা নয়, সংযোগে পরিণত করার দাবি।