Advertisement

আজীবন সম্মাননায় সিক্ত কিংবদন্তি অভিনেত্রী শবনম

সাত ও আটের দশকের চলচ্চিত্রপর্দায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী কিংবদন্তি অভিনেত্রী শবনম। তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলিয়ে এক অনন্য উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে গেছেন তিনি। অভিনয়জীবনের বর্ণিল পথচলায় আশি বছর পূর্ণ করার এই ক্ষণে, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩-এ আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হওয়ার খবরটি যেন তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সার্থকতাকে আরও মূর্ত করে তুলল। বারিধারার নিজ বাসভবনে বসে স্মৃতিরোমন্থন করতে গিয়ে তিনি জানান, রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতি একজন শিল্পীর জন্য কতটা আবেগের। ছোটবেলায় স্কুলের সাধারণ পুরস্কারে যেমন আনন্দিত হতেন, আজও সেই একই শিহরণ কাজ করে তাঁর মনে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় আজও মানুষ যখন তাঁকে ‘হারানো দিন’ সিনেমার সেই জনপ্রিয় গানের কথা মনে করিয়ে দেয়, তখনই তিনি অনুভব করেন—শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুই হতে পারে না।

শবনমের শৈশব কেটেছে পুরান ঢাকার নবাবপুরের মদনমোহন বসাক লেনে। তাঁর আসল নাম ঝর্ণা বসাক। ছোটবেলায় ফুটবল বাদে প্রায় সব খেলায় পারদর্শী এই ‘টমবয়’ ধাঁচের মেয়েটির অভিনয়ে আসার পেছনে ছিল এক মজার গল্প। বাবা ননী বসাক ছিলেন শিক্ষক, আর মা উষা বসাক গৃহিণী। বোন সন্ধ্যা বসাককে বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নাচ শিখতে দেখে ঝর্ণাও নাচের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সেই একাডেমির সূত্রেই পরিচালক এহতেশামের চোখে পড়েন তিনি। শুরুতে মা রাজি না হলেও বাবার দৃঢ় আগ্রহে প্রথম সিনেমায় নাম লেখান ঝর্ণা। এরপর ‘হারানো দিন’ সিনেমার মাধ্যমে ‘শবনম’ হয়ে ওঠেন তিনি। পড়াশোনা ও অভিনয়ের টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রকেই বেছে নেন, যদিও পরবর্তী জীবনে শিক্ষার অভাব তিনি কিছুটা অনুভব করেছেন। তবে নিজের মেধা ও একাগ্রতা দিয়ে তিনি উর্দু ভাষা রপ্ত করেন এবং পাকিস্তানজুড়ে এক অনবদ্য তারকাখ্যাতি অর্জন করেন।

বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিজীবনে সুরকার রবিন ঘোষের সঙ্গে তাঁর প্রেম ও পরিণয়ের গল্পটিও বেশ নাটকীয়। লাহোরে একটি ক্রিকেট ম্যাচ উপলক্ষে ভ্রমণে গিয়ে হোটেলকক্ষে রবিন ঘোষের প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছিলেন তিনি। রবিন ছিলেন তাঁর ক্যারিয়ারের প্রধান সারথি ও পথপ্রদর্শক। পাকিস্তানে কাজ শুরুর গল্প বলতে গিয়ে তিনি জানান, প্রযোজক ইলিয়াস রশিদী ও রবিন ঘোষের উৎসাহে করাচি যান তিনি। সেখানে প্রথম ছবি ‘সামান্দার’ দিয়ে শুরু, এরপর লাহোরে স্থায়ী হওয়া। পাকিস্তানের মাটিতে অভিনয় করাটা শুধু পেশাগত চ্যালেঞ্জ ছিল না, ছিল বাঙালিদের সক্ষমতার প্রমাণ। নাদিম ও ওয়াহিদ মুরাদের মতো সুপারস্টারদের সঙ্গে অভিনয় করে তিনি গড়ে তোলেন ঈর্ষণীয় এক ক্যারিয়ার। বিশেষভাবে নাদিমের সঙ্গে তাঁর রসায়ন ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী; ৫০টিরও বেশি ছবিতে তাঁদের জুটি ছিল দর্শকদের কাছে স্বপ্নের মতো।

ব্যস্ত কর্মময় জীবনেও তিনি ছিলেন নিয়মনিষ্ঠ। দিনে চারটি ছবির শুটিং করা, নিজস্ব ভ্যানে কস্টিউম ও জুয়েলারি গুছিয়ে রাখা—সবই ছিল তাঁর নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ। শত ব্যস্ততার মাঝেও পরিবার ও সংসারের ভারসাম্য বজায় রেখেছেন দারুণভাবে। আজও পাকিস্তানের দর্শক ও সহকর্মীদের কাছে তিনি শ্রদ্ধার পাত্রী। বিশেষ করে নাদিমের সঙ্গে তাঁর পেশাগত বন্ধুত্ব ও শ্রদ্ধাবোধ এখনো অটুট। তাঁর অভিনীত ‘আয়না’, ‘বন্দিশ’, ‘দোস্তি’ ও ‘পেহচান’-এর মতো ছবিগুলো কালজয়ী হয়ে আছে। নব্বইয়ের দশকের শেষে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে ফিরে এলেও শবনম নামটি আজও ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলছে। আশি বছর বয়সেও তিনি বিনম্র, পরিশীলিত এবং নিজের অর্জিত সেই বর্ণিল ইতিহাসের প্রতি কৃতজ্ঞ।

বিজ্ঞাপন
0%
0%
0%
0%