Advertisement

আজীবন সম্মাননা ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সন্ধিক্ষণে বরেণ্য অভিনেত্রী শবনম

ষাটের দশকের শুরু থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত রুপালি পর্দার জাদুকরী আবেশে দর্শকদের সম্মোহনী মায়ায় আটকে রেখেছিলেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী শবনম। ছোটবেলায় নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন দূরে থাক, বরং টমবয় স্বভাবের ঝরনা বসাক তখন মশগুল থাকতেন ক্রিকেট, ঘুড়ি ওড়ানো আর মার্বেল খেলায়। অথচ ভাগ্যের কি পরিহাস, স্কুলজীবন শেষ হতে না হতেই তিনি হয়ে উঠলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক তারকা। ১৯৬১ সালে ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে খ্যাতির শিখরে আরোহণের পর আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বাংলাদেশ ছাপিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানেও তিনি হয়ে ওঠেন সর্বোচ্চ প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী। দুই দেশ মিলিয়ে ১৮০টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করে তিনি যে উচ্চতা স্পর্শ করেছেন, তা বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে বিরল। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে অসংখ্য নিগার অ্যাওয়ার্ড ও সিতারা-ই-ইমতিয়াজের মতো মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা অর্জন করা এই কিংবদন্তি ২০২৩ সালে পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা। আশির কোঠায় পা রাখা এই বরেণ্য শিল্পী বারিধারার বাসভবনে সম্প্রতি এক দীর্ঘ আড্ডায় তুলে ধরেছেন তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের নানা অধ্যায়।

আলাপের শুরুতেই উঠে আসে ১৯৮৭ সালে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘সন্ধি’ সিনেমায় অভিনয়ের সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা। সেই সময়ে পাকিস্তানে তুমুল ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও নিজের ভাষার চলচ্চিত্রের প্রতি টানে তিনি ছুটে এসেছিলেন ঢাকায়। তবে সেই শুটিং ছিল চ্যালেঞ্জের। এফডিসিতে শুটিংয়ের প্রথম দিন প্রম্পটিং শুনেই ক্ষেপে গিয়েছিলেন তিনি। সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, স্ক্রিপ্ট মুখস্থ ছাড়া তিনি অভিনয় করবেন না। তাঁর সেই জেদ আর পেশাদারিত্বের কাছে মাথা নত করেছিলেন তৎকালীন সময়ের সুপারস্টার রাজ্জাক ও জাফর ইকবাল। শেষ পর্যন্ত সবাই চিত্রনাট্য মুখস্থ করেই সেই ছবির কাজ সম্পন্ন করেন। শবনম জানান, তাঁর ক্যারিয়ারের প্রতিটি কাজই ছিল এমন নিখুঁত প্রস্তুতির ফসল। এমনকি কাজী হায়াতের ‘আম্মাজান’ ছবির ক্ষেত্রেও তাঁর এই কঠোর নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেনি।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পরিবেশ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সে সময় টেকনিক্যাল দিক দিয়ে পাকিস্তান এগিয়ে থাকলেও গল্পের গভীরতা ও আবেগের দিক থেকে বাংলাদেশ ছিল অনেক বেশি সমৃদ্ধ। তবে ক্যারিয়ারের এই দীর্ঘ পথচলায় তাঁকে শুনতে হয়েছে শাবানার সাথে স্নায়ুযুদ্ধের গল্প। এ প্রসঙ্গে শবনম অত্যন্ত সাবলীল। তিনি জানান, শাবানার সাথে তাঁর সম্পর্ক সবসময়ই ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ। যত দ্বন্দ্ব ছিল শাবানার স্বামী ওয়াহিদ সাদিকের সাথে। তাঁর অভিযোগ, ওয়াহিদ সাদিক পেশাগত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে এক সময় তাঁর শুটিং পর্যন্ত বন্ধ করিয়ে দিয়েছিলেন। তবে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান এরশাদ সাহেবের হস্তক্ষেপে সব প্রতিকূলতা জয় করেছিলেন তিনি। গাড়ি চালিয়ে নিজে এফডিসিতে প্রবেশের মতো সাহসী ও আধুনিক নারী হিসেবে তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে যে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন, তা আজও অনেকের অনুপ্রেরণা।

ব্যক্তিগত জীবনের বেদনার কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। একমাত্র সন্তান রনিকে কাছে না পাওয়ার আক্ষেপ ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষত। সেইসাথে মা-বাবার মৃত্যুর সময় পাশে থাকতে না পারার কষ্ট আজও তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। তবে এসবের মাঝেও নাদিমের সাথে পঞ্চাশটি সিনেমার জুটি কিংবা রবিনের কালজয়ী সুরের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো তাঁর জীবনের পরম প্রাপ্তি। সিনেমার বাইরে তিনি এখন নিজের মতো করে সময় কাটাচ্ছেন, ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর সুরের মূর্ছনায় খুঁজে নিচ্ছেন পুরোনো দিনের স্মৃতি।

বিজ্ঞাপন

এফডিসির বর্তমান পরিবেশ নিয়ে তাঁর কণ্ঠে ঝরেছে তীব্র অভিমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মৃত্যুর পর যেন কোনোভাবেই তাঁর মরদেহ এফডিসিতে নেওয়া না হয়। দীর্ঘ অভিনয় জীবনের পাট চুকিয়ে এখন তিনি ব্যক্তিগত স্বস্তিতেই থাকতে চান। তাঁর মতে, অভিনয়শিল্পীরা কখনো সবকিছু শিখে ফেলেন না, বরং প্রতিক্ষণ নতুন করে শিখতে হয়। ভালো চিত্রনাট্য পেলে এখনো ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সাহস রাখেন এই জীবন্ত কিংবদন্তি। জীবনের হিসাব-নিকাশে কোনো অনুশোচনা না থাকলেও কর্মময় জীবনের যান্ত্রিকতার ভিড়ে সন্তানকে সময় দিতে না পারার বেদনা তাঁকে আজও দহন করে। কিন্তু শবনম মানেই যে এক অমর সত্তা, তা তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের পথচলাই সাক্ষ্য দেয়। আজও তিনি বাংলার মানুষের কাছে সেই চিরচেনা, চিরসবুজ ‘শবনম’ হয়েই বেঁচে আছেন।

0%
0%
0%
0%