প্রতিবাদের মাসুল হিসেবে দীর্ঘ কর্মহীনতা ও আর্থিক সংকটের মুখ দেখলেন দেবলীনা দত্ত

সিনেমা আর বাস্তব জীবনের টানাপোড়েন যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে তারকাদের ব্যক্তিগত পরিসরে। সম্প্রতি বড় পর্দায় মুক্তি পাওয়া ‘ছবিওয়ালা’ সিনেমায় প্রয়াত অভিনেতা রাহুলের বিপরীতে দেবলীনা দত্তের অনবদ্য অভিনয় দর্শক ও সমালোচক মহলে প্রশংসা কুড়ালেও, পর্দার পেছনের এক ভয়াবহ সত্য উন্মোচন করলেন এই অভিনেত্রী। সুব্রত সেনের পডকাস্ট চ্যানেল ‘ফিল্মওয়ালা’য় দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে দেবলীনা তুলে ধরেন তাঁর ক্যারিয়ারের সেই অন্ধকার সময়, যখন দীর্ঘ দুই বছর কর্মহীন হয়ে কার্যত ঘরবন্দি থাকতে হয়েছিল তাঁকে।
আরজি কর কাণ্ডের পর ন্যায়ের দাবিতে রাজপথে সরব হওয়াটাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল অভিনেত্রীর জন্য। প্রতিবাদী কন্ঠস্বর হওয়ার মাশুল হিসেবে হাতছাড়া হতে থাকে একের পর এক কাজ। দেবলীনার ভাষ্যমতে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও শুধুমাত্র মানবিক জায়গা থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাঁকে একটি নির্দিষ্ট রঙের ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় কোনো পরিচালক বা প্রযোজক চাইলেও ঝুঁকি নিতে পারেননি। তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়েই হোক কিংবা অদৃশ্য কোনো চাপের কারণে, তাঁকে কাজ দেওয়ার আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত কেউই সাহস সঞ্চয় করতে পারেননি। কারণ, দেবলীনাকে কাস্ট করলে সেই সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পথই বন্ধ হয়ে যেত।
পেশাগত এই সংকটের প্রভাব পড়েছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও। দীর্ঘসময় কাজ না থাকায় তীব্র আর্থিক অনটনের মুখে পড়েন এই প্রতিভাবান অভিনেত্রী। নিজের এবং পরিবারের ভরণপোষণ, এমনকি পোষ্য সারমেয়দের খাবারের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হয় তাঁকে। একসময় পরিস্থিতি এতটাই সঙ্গিন হয়ে ওঠে যে, নিজের সাধের ঘরবাড়ি বিক্রির চিন্তাও করতে হয়েছিল তাঁকে। বাধ্য হয়ে ভাঙতে হয়েছিল দীর্ঘদিনের জমানো ফিক্সড ডিপোজিট।
তবে দেবলীনা একা নন, টলিপাড়ার বহু শিল্পীর কন্ঠেই শোনা গেছে একই সুর। তৎকালীন সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার দায়ে ব্যান বা নিষিদ্ধ হওয়ার মতো নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছিল অনেককেই। সেই দুঃসহ সময় এখন অতীত হলেও, একজন শিল্পীর স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার যে কত বড় মূল্য চোকাতে পারে, দেবলীনার এই অকপট স্বীকারোক্তি যেন তারই এক জ্বলন্ত দলিল। বর্তমান সময়ে পরিস্থিতি বদলেছে, নতুন করে কাজের ছন্দে ফিরেছেন বহু শিল্পী, কিন্তু সেই লড়াইয়ের স্মৃতি আজও তাঁদের মনের কোণে গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।
