যুক্তরাষ্ট্রে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জনমত কমছে অথচ তীব্র দাবদাহের প্রভাব বাড়ছে জনজীবনে

যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের অস্তিত্ব নিয়ে বিশ্বাসের হার কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চের সাম্প্রতিক যৌথ জরিপ অনুযায়ী, ৬৬ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে, যা গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ৭৩ শতাংশ। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৭ শতাংশ বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন এবং ১৫ শতাংশের মতে জলবায়ু পরিবর্তন মোটেই ঘটছে না।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বাস কিছুটা কমলেও, দৈনন্দিন জীবনে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। গত জুলাই মাসে ১,১৬৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ওপর চালানো এই জরিপে দেখা গেছে, আগের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ তীব্র গরমের কারণে তাদের নিয়মিত কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্নের শিকার হচ্ছেন। জরিপে ৩০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, অতি তাপমাত্রার কারণে তাদের বহিরাঙ্গন কার্যক্রমে বড় প্রভাব পড়েছে, যা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছিল ২১ শতাংশ।
তাপপ্রবাহের কবলে পড়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা ও ছুটির দিনগুলোতে প্রভাব পড়ার হারও দ্বিগুণ হয়েছে। এছাড়া ব্যায়ামের রুটিন, ঘুমের ধরন এবং যাতায়াত ব্যবস্থায় প্রচণ্ড গরমের বিরূপ প্রভাব প্রকট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মিডওয়েস্ট এবং ওয়েস্ট কোস্ট অঞ্চলের বাসিন্দারা এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন। ভার্জিনিয়া টেক ইউনিভার্সিটির জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের তথ্য মতে, মে মাস নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬০ শতাংশ অঞ্চল খরা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেছে, যার মধ্যে ২০ শতাংশ এলাকায় খরা চরম আকার ধারণ করেছে।
তীব্র তাপপ্রবাহ কেবল জনজীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না, বরং তা জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮১ শতাংশ আমেরিকান জানিয়েছেন, গত এক বছরে তাদের বিদ্যুৎ বিলে তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়েছে, যা আগের বছর ছিল ৬৯ শতাংশ। ডেমিয়েন উইলিয়ামস নামের একজন অংশগ্রহণকারী জানান, গত তিন-চার বছরে তার বিদ্যুৎ খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা শুধু উচ্চমূল্য নয় বরং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারেরও প্রতিফলন।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন এখন একটি বড় হুমকি হিসেবে স্বীকৃত। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, মানবসৃষ্ট নানা কর্মকাণ্ডের প্রভাবে পৃথিবী উত্তপ্ত হচ্ছে এবং ২০২৩ ও ২০২৪ সালের পর ২০২৫ সালও ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণতম বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় ১,২২০ জনের মৃত্যু হয় অতিরিক্ত তাপজনিত কারণে। ২০২৩ সালে এই মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২,৩০০, যা গত ৪৫ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
তীব্র দাবদাহের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বৃদ্ধি, ফসলের ক্ষয়ক্ষতি এবং বিদ্যুৎ গ্রিডের মতো অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারী অনেক সাধারণ মানুষও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে জানিয়েছেন যে, তাদের ছোটবেলার তুলনায় বর্তমানে গ্রীষ্মকাল অনেক দীর্ঘস্থায়ী এবং অসহনীয় হয়ে উঠেছে। জন হেজেল নামের একজন মন্তব্য করেন, আগে তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়ানো বিরল ঘটনা ছিল, কিন্তু এখন এটি যেন দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
