রাজশাহীতে রইদ চলচ্চিত্রের শিল্প ও দর্শন নিয়ে বিশেষজ্ঞ ও নির্মাতার বিশদ আলাপন

রাজশাহীর আকাশ তখন মেঘাচ্ছন্ন, যেন প্রকৃতি নিজেও অপেক্ষায় ছিল এক গভীর শিল্পতাত্ত্বিক আলোচনার। ভোরের আলো ফুটতেই মুষলধারে বৃষ্টিতে সিক্ত হয়েছিল পুরো শহর, তবে বিকেলের সেই অঝোর ধারার মেঘও দমিয়ে রাখতে পারেনি সিনেমাপ্রেমীদের উদ্দীপনা। ম্যাজিক লণ্ঠন স্কুলের প্রাঙ্গণে আয়োজিত হয়েছিল ‘রইদ: প্রতীক, পুনরাবৃত্তি, প্রেম ও পৌরাণিক আলো-আঁধারি ভাষার সামষ্টিক অধ্যয়ন’ শীর্ষক এক অনন্য আয়োজন। বৃষ্টিস্নাত বিকেলে খোলা আকাশের নিচে চলচ্চিত্রের ভাষা ও দর্শন নিয়ে জমজমাট আড্ডা গড়িয়েছিল রাত পর্যন্ত।
এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক মানস চৌধুরী, নির্মাতা নূরুল আলম আতিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যমের অধ্যাপক আ-আল মামুন, নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুস সালাম জীবন এবং কথাসাহিত্যিক মামুন হুসাইনসহ একঝাঁক বিদগ্ধ মানুষ। নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনের সঙ্গে ছিলেন সিনেমার প্রধান দুই তারকা নাজিফা তুষি ও আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদসহ কলাকুশলীদের পুরো দল। আয়োজনের শুরুতেই ম্যাজিক লণ্ঠন স্কুলের কার্যনির্বাহী সদস্য এস এম অনিক ইসলাম জানান, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে কেবল বিনোদনের গণ্ডিতে না আটকে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ উদ্যোগ।
আলোচনার মূল আকর্ষণ ছিল ‘রইদ’ সিনেমার নির্মিতি ও এর গভীরে লুকিয়ে থাকা সংকেত। অধ্যাপক মানস চৌধুরী অভিমত ব্যক্ত করেন যে, চলচ্চিত্রকে ‘আর্ট’ বা ‘বাণিজ্যিক’—এমন গতানুগতিক ছাঁচে না ফেলে বরং এর ভিজ্যুয়াল ভাষা ও সাহসিকতাকে মূল্যায়ন করা জরুরি। নূরুল আলম আতিকের মতে, ‘হাওয়া’র পর ‘রইদ’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা তৈরির লড়াইকে আরও বেগবান করেছে, যা শিল্প ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যকার অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে দিচ্ছে।
নিজের সৃষ্টি নিয়ে বলতে গিয়ে মেজবাউর রহমান সুমন বলেন, একটি শিল্পের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায় যখন দর্শক তার নিজস্ব মনন দিয়ে তাকে ব্যাখ্যা করেন। মায়ের মুখে শোনা লোককাহিনির সরলতাকে তিনি সিনেমার পর্দায় রূপ দিয়েছেন আমাদের ভূখণ্ডের পুরাণ, দর্শন ও লোকবিশ্বাসের সংমিশ্রণে। সুমনের কথায়, “গল্পের সরলতা আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া, কিন্তু সেই গল্পের জটিলতাটুকু আমিই তৈরি করেছি।”
চিত্রগ্রাহক জোহায়ের মুসাভ্বির জ্যোতি জানান, ক্যামেরা এখানে কেবল যান্ত্রিক নয়, বরং গল্প বলার অন্যতম প্রধান ভাষা। নির্মাণ প্রক্রিয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে সুমন জানান, শুটিংয়ের আগেই লোকেশন ও পরিবেশকে জীবন্ত করে তোলা হয়েছিল, যাতে শিল্পীদের অভিনয় যেন আরোপিত না মনে হয়। অনুষ্ঠানের শেষভাগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হালিমাতুস সাদিয়ার কণ্ঠে সিনেমার একটি গান পরিবেশন দর্শকদের মাঝে এক মায়াবী আবহ তৈরি করে। বৃষ্টির দিনে শিল্প ও দর্শনের এই মিলনমেলা রাজশাহীর শিল্পমোদীদের মনে এক গভীর রেশ রেখে গেল।