দেশে চলমান তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যবস্থা যখন বিপর্যস্ত, তখন স্থবির অর্থনীতিকে সচল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা কারখানাগুলো পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যেই মূলত এই বিশেষ তহবিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই প্যাকেজের আওতায় ৪১ হাজার কোটি টাকা জোগান দেওয়ার বিষয়ে ইতিমধ্যে ১৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রাথমিক সম্মতি জানিয়েছে। চলতি সপ্তাহেই এসব ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
বর্তমানে শিল্প মালিকদের মধ্যে এ উদ্যোগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশের মতে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত না করে বন্ধ কারখানায় নতুন করে অর্থায়ন করা হলে তা ব্যাংক খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম স্পষ্ট জানিয়েছেন, নতুন করে বন্ধ কারখানা চালু করার চেয়ে বর্তমানে সচল কিন্তু সংকটে থাকা কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখা বেশি জরুরি। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুতের জোগান ছাড়া নতুন অর্থায়ন বিনিয়োগের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
এ বাস্তবতাকে স্বীকার করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বন্ধ কারখানাগুলোতে আগে থেকেই অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি বিদ্যমান থাকায় সঠিক তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে পুনরুজ্জীবন প্রকল্প থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরী মনে করেন, মূলধনী বিনিয়োগ সাশ্রয় করে উৎপাদন বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এটি একটি কৌশলগত সুযোগ। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, জ্বালানি সংকটের মতো মৌলিক সমস্যা সমাধান না হলে এ ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও অর্থ অপব্যবহার রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর নজরদারির কথা জানিয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় কোন প্রতিষ্ঠান ঋণ পাচ্ছে এবং তা সঠিকভাবে উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষ ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে। সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, ব্র্যাক, সিটিসহ মোট ৩৭টি ব্যাংক ইতিমধ্যে এই কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে সোনালী ব্যাংক একাই ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা প্যাকেজের বড় একটি অংশ।
ব্যাংকগুলোর নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন জ্বালানির সহজলভ্যতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ঋণের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রশ্ন তুলেছেন, কারখানায় গ্যাসই যদি না থাকে, তবে শুধু কম সুদের ঋণে উৎপাদন সচল রাখা অসম্ভব। উল্লেখ্য, গত ২৩ মে ঘোষিত এই প্যাকেজের ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে আসবে এবং বেসরকারি উদ্যোক্তারা সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে এই ঋণ সুবিধা পাবেন।