পরিবর্তিত বিশ্ববাজার ও পণ্য বৈচিত্র্যে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের পোশাক খাত

বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাকের বাজারে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে এবং চীনের হারানো বাজার দখলে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। কৌশলগত শুল্ক সুবিধার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার অবারিত সুযোগ থাকলেও, সময়ের সঙ্গে পণ্যের বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে না পারায় সেই সম্ভাবনা ম্লান হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি মূলত কটন বা সুতিভিত্তিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান মেইড ফাইবারের (এমএমএফ) চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

ইউএস অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি গত বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর বিপরীতে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কারখানা ট্রাউজার, টি-শার্ট ও সোয়েটারের মতো পাঁচটি মৌলিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, যার ফলে ক্রেতাদের পছন্দের বৈচিত্র্য ও পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এক্ষেত্রে বন্দর ও কাস্টমসের প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘ লিড টাইম এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতিকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে এবং বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বাড়াতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ সেই তুলনায় পিছিয়ে আছে। তাছাড়া কৃত্রিম তন্তু উৎপাদনে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন, যা শিল্পের সামগ্রিক অগ্রগতির পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী জানান, পরিবর্তিত বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে কৃত্রিম তন্তু উৎপাদনকারী শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিশেষ প্রণোদনা ও ব্যাংকের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা জরুরি। এছাড়া প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এস এম আবু তৈয়ব বলেন, ভিয়েতনামের মতো দ্রুততম সময়ে কাঁচামাল প্রাপ্তি ও সরবরাহের সক্ষমতা অর্জনে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নীতি সহায়তা অপরিহার্য।

ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা গড়ে অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অথচ ২০২৬ সালের জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন মার্কিন শুল্ক কাঠামোয় বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক কম শুল্কের সুবিধা রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের অভিমত, কটনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এমএমএফ বা সিনথেটিক পণ্য উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তি ও নীতিগত সংস্কার আনতে পারলে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে আবারও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ফিরে পাবে।

০%
০%
০%
০%