দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটের কবলে পড়ে শিল্প খাতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। টানা তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংকট বুধবার থেকে আরও প্রকট আকার ধারণ করায় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শত শত কারখানার চাকা বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় শিল্পোদ্যোক্তারা যেমন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন, তেমনি কর্মহীন হওয়ার শঙ্কায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে হাজারো শ্রমিক-কর্মচারীর। রপ্তানি আদেশ সময়মতো সম্পন্ন করতে না পারার অনিশ্চয়তায় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
শিল্পকারখানার জন্য বরাদ্দকৃত গ্যাসের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিশেষ করে হবিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হবিগঞ্জে গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে গ্যাসের চাপ কমতে শুরু করলেও বুধবার থেকে অনেক কারখানায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে জেলাটির ১৭১টি ছোট-বড় কারখানার উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে, যার ফলে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক এখন বেকার হওয়ার উপক্রম।
নারায়ণগঞ্জের চিত্রও একই রকম হতাশাজনক। গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় জেলার প্রায় ৪৫০টি ডায়িং কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, ডায়িং থেকে ফ্যাব্রিক্স সরবরাহ না পাওয়ায় শতাধিক পোশাক কারখানাও এখন বন্ধের পথে। সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই চিত্র বিরাজ করছে, যেখানে উৎপাদন কমে যাওয়ায় চলতি মাসেই তিন থেকে চার হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাত ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপরও। নারায়ণগঞ্জের ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের প্রায় সবকটিতেই গ্যাসের তীব্র সংকট থাকায় চালকদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। সাধারণ আবাসিক গ্রাহকরাও রান্নার গ্যাস নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন। এদিকে, সংকট উত্তরণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ী নেতারা। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, শিল্প খাতের এই সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রপ্তানি আয়ে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর ভরসা করেই মূলত শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ সচল রাখা হয়। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকেই সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়। যদিও ৬ আগস্ট থেকে আংশিক সরবরাহ শুরু হয়েছে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের বাকি সরঞ্জাম পরীক্ষার জন্য আরও অন্তত ৭২ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদনই নয়, বরং ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও অন্যান্য আর্থিক দায় মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। শিল্পকারখানার এই অচলাবস্থা নিরসনে ত্বরিত ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই পরিস্থিতি নিরসনে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।