খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, আর্থিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং দীর্ঘসূত্রতার সত্যতা মিলেছে। এই ঘটনায় জড়িত অভিযোগে সংস্থাটির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীসহ মোট ১১ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান অ্যান্ড মাহাবুব ব্রাদার্সকে কালো তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব দীপক কুমার রায়ের সই করা এক চিঠিতে এসব নির্দেশনা প্রদান করা হয়।
মন্ত্রণালয়ের তদন্তে উঠে এসেছে যে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়েছিল। এছাড়া সরকারের উন্নয়ন বাজেটের (জিওবি) বরাদ্দ থেকে ১৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা কেডিএর নিজস্ব তহবিলে স্থানান্তরের গুরুতর অভিযোগের প্রমাণও পাওয়া গেছে। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত কর্মকর্তারা হলেন—তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহিদ আজহার, তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী সাবিরুল আলম, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প মজিবুর রহমান, প্রকল্প পরিচালক আরমান হোসেন, উপপ্রকল্প পরিচালক মুনতাসির মামুন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামীম জেহাদ, ক্যাশিয়ার মেহেদী হাসান, সহকারী হিসাবরক্ষক পলাশ কুমার ঘোষ, হিসাবরক্ষক শাহানা আক্তার, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সাইদুল হক এবং অর্থ ও হিসাব রক্ষণ অফিসার হোসেন আলী।
কেডিএ সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ৭ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। শুরুতে এর ব্যয় ৯৮ কোটি টাকা নির্ধারিত হলেও দীর্ঘ ১৩ বছরেও তা শেষ হয়নি। উল্টো কয়েক দফা সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮০ কোটি টাকায়। গত ৯ জুন একনেকে প্রকল্পটির তৃতীয় দফা সংশোধন ও ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে গাফিলতি ও দীর্ঘসূত্রতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবিলম্বে চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর সেদিনই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি প্রকল্পের বিভিন্ন নথি, আর্থিক লেনদেন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে ৪০৪ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন গত ৩১ আগস্ট গৃহায়ন সচিবের কাছে জমা দেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, সমীক্ষা ছাড়া ডিপিপি তৈরি এবং বরাদ্দকৃত অর্থ নিজস্ব তহবিলে স্থানান্তরের মাধ্যমে আর্থিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এই প্রেক্ষাপটেই মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে তা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজী সাবিরুল আলম বর্তমানে কেডিএর প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে রয়েছেন। তার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি এবং খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে কেডিএর চেয়ারম্যান শফিকুল আলম মনা জানান, মহানগরী খুলনার অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার এই শিপইয়ার্ড সড়ক নিয়ে অতীতে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা হয়েছে। প্রকল্পটির ওপর গঠিত তদন্তের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা মন্ত্রণালয়ের চিঠি হাতে পেয়েছেন এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কেউ ছাড় পাবে না উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, খুব শিগগিরই শিপইয়ার্ড সড়কের বাকি কাজ শুরু হবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা সম্পন্ন করে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব করা হবে।