আবারও পুরোনো বিতর্কিতদের দখলে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক

সরকারি উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় পুরোনো উদ্যোক্তাদের হাতে ন্যস্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও অনিয়মের অভিযোগ থাকার পরেও ব্যাংকটির নতুন পর্ষদ গঠনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ এখন চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপের কবজায়। এই পুনর্গঠনের পরপরই ব্যাংকটিতে পুরনো বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন এবং একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পদত্যাগের ঘটনায় ব্যাংকিং খাতে নতুন করে অস্থিরতা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যাংকটির নতুন পর্ষদ গঠনের মাত্র দুই দিনের মাথায় আইনগত বাধ্যবাধকতায় দুইজন পরিচালককে বাদ দিতে হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী এক পরিবার বা গ্রুপ থেকে তিনজনের বেশি পরিচালক থাকার সুযোগ না থাকায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে কেডিএস গ্রুপের প্রতিনিধি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম পদ গ্রহণ করেননি। তাদের পরিবর্তে খন্দকার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদকে নতুন পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা।
উল্লেখ্য, বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংকটি মূলত এস আলম গ্রুপ ও কেডিএস গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তৎকালীন চেয়ারম্যান সেলিম রহমান এবং এস আলম পরিবারের সদস্য আবদুস সামাদ লাবুর বিরুদ্ধে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার বিলাসবহুল মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি কেনায় নিয়মবহির্ভূত ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি ও অভ্যন্তরীণ তদন্তে। ওই সময় অর্থ আত্মসাৎ ও হিসাবের স্বচ্ছতা এড়াতে গাড়িগুলোকে ব্যাংকের নিজস্ব সম্পদ হিসেবে না দেখিয়ে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধন করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে হেফাজতে নেওয়া হয়।
কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, যিনি ইতিপূর্বে ন্যাশনাল ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালীন নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার আসামি হয়েছিলেন এবং কারাবরণও করেছেন, তাকেই পুনরায় আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদে জায়গা দেওয়া হয়েছে। নতুন পর্ষদ গঠনের পর ব্যাংকটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হোসেনকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পেশাদারিত্ব বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকের আমানত গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ৫৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা এবং ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার ১২১ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির ঋণের ১৭ দশমিক ৬১ শতাংশই খেলাপি। উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে গত দুই বছরে কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে না পারায় শেয়ারবাজারে ব্যাংকটি জেড ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে। সারা দেশে ২২৬টি শাখা ও পাঁচ হাজার ৫৯৩ জন কর্মী নিয়ে পরিচালিত এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যারা অতীতে ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের হাতে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া সুদূরপ্রসারী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের চাপের মুখে বাধ্য হয়েই এই পর্ষদ পুনর্গঠন করতে হয়েছে। অভিজ্ঞ মহলের আশঙ্কা, যদি অতীত ইতিহাস উপেক্ষা করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রাখা হয়, তবে সেটি সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরণের বিপর্যয় ডেকে আনবে।
