AdvertisementAdvertisement

পুলিশের গুলিতে পঙ্গু আটজনের জীবন এখন মামলার বেড়াজালে বন্দী

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিগত সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করা আটজনের জীবন এক যুগ পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক হয়নি। গুলিবিদ্ধ হয়ে পা হারানো এসব ব্যক্তি দীর্ঘ চিকিৎসা, কর্মহীনতা ও শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি বর্তমানেও আইনি জটিলতার বেড়াজালে আটকা পড়ে দুর্বিষহ সময় পার করছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হেফাজতে নির্যাতনের পর তাদের পায়ে গুলি করা হয় এবং ঘটনা ধামাচাপা দিতেই উল্টো তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের মধ্যে সাতকানিয়ার এওচিয়া ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামের পাঁচজন রয়েছেন। স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণকারী ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন আবু তাহের, কামাল উদ্দিন, মো. রফিক, এনামুল হক, শহিদুল ইসলাম, সাজু আক্তার, আরাফাত ও সাইফুল ইসলাম। তাদের মধ্যে কারো বিরুদ্ধে পাঁচটি, কারো ১৯টি, আবার কারো বিরুদ্ধে ৬৫টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিতে গিয়ে তারা অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

সাতকানিয়ার আবু তাহেরকে ২০১৩ সালে খামারবাড়ি থেকে তুলে নিয়ে তিনদিন আটকে রেখে নির্যাতনের পর পায়ে গুলি করা হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও সংক্রমণের কারণে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয় এবং পরবর্তীতে তাকে আটটি মামলায় আসামি করা হয়। একইভাবে প্রবাস ফেরত কামাল উদ্দিনকে আটক করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়; দাবিকৃত টাকা না পেয়ে তার পায়ে গুলি চালানো হলে চিকিৎসকরা তার ডান পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন। মো. রফিকের ওপর চালানো নৃশংসতা ছিল ভয়াবহ, যেখানে পুলিশ তাকে বারবার গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে রফিকের শরীরে দুটি গুলি রয়ে গেছে এবং একটি পা হারিয়ে তিনি ৬৫টি মামলার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন।

এনামুল হককে ২০১৩ সালে তুলে নিয়ে নির্যাতনের পর হাঁটুতে গুলি করা হয় এবং কারাবন্দি অবস্থায় তাকে ১৯টি মামলার আসামি করা হয়। এছাড়া শহিদুল ইসলামকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অপহরণের পর কবরস্থানে নিয়ে পায়ে ছয়টি গুলি করা হয়। ঘটনার শিকার সাজু আক্তার, আরাফাত এবং সাইফুল ইসলামের পরিণতিও ছিল একই রকম। বিশেষ করে সাইফুল ইসলাম পুলিশের গুলিতে পা হারানোর পর দীর্ঘ সময় কারাভোগ করেছেন এবং এখনো তার বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

২০১৩ সালে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন প্রণয়ন করা হলেও ভুক্তভোগীরা জানান, এই আইনের কার্যকর প্রয়োগ তারা কখনো দেখেননি। বরং আইনি লড়াইয়ের পথে পা বাড়াতে গিয়ে তারা পাল্টা মামলার শিকার হয়েছেন এবং হয়রানির ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে পারেননি। মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, তৎকালীন সরকার আন্তর্জাতিক মহলের চাপ সইতে এই আইন পাস করলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল কেবলই একটি লোক দেখানো উদ্যোগ। হাসিনা সরকারের পতনের পর বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী এসব মানুষ এখন ন্যায়বিচারের আশায় নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন।

এ ঘটনায় স্থানীয়রা ও নিহতের পরিবারের সদস্যরা জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতিসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

0%
0%
0%
0%