১৯৪৯ সালে নিহত কয়লাখনি শ্রমিকদের পরিবারকে হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দিতে ব্রিটিশ সরকারকে নির্দেশ

নাইজেরিয়ার একটি আদালত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে সংঘটিত এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। ১৯৪৯ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত ২১ জন কয়লাখনি শ্রমিকের প্রত্যেক পরিবারের জন্য প্রায় তিন হাজার তিনশ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে ব্রিটিশ সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দেওয়া এই রায়ের মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে চলা ক্ষতিপূরণের দাবিতে আইনি লড়াইয়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। নাইজেরিয়ায় এই হত্যাকাণ্ডকে দেশটির স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঘটনার ১১ বছর পর, ১৯৬০ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে নাইজেরিয়া।

কী ঘটেছিল ১৯৪৯ সালে

১৯৪৯ সালে নাইজেরিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এনুগু রাজ্যের ইভা ভ্যালি কয়লাখনিতে শ্রমিকেরা কঠোর ও অমানবিক কর্মপরিবেশের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন। তারা খনির ভেতরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করলে ঔপনিবেশিক পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই ২১ জন শ্রমিক নিহত হন এবং আরও বহু শ্রমিক গুরুতর আহত হন।

আদালতের রায় ও ক্ষতিপূরণের অঙ্ক

এনুগু হাইকোর্টের বিচারক অ্যান্থনি অনোভো রায়ে বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন সরাসরি দায়ী। তিনি নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে প্রত্যেককে দুই কোটি পাউন্ড করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, প্রতি পাউন্ড প্রায় ১৬৮ টাকা ধরে হিসাব করলে—

  • প্রতিটি পরিবার পাবে আনুমানিক ৩ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা
  • ২১টি পরিবারকে মোট ক্ষতিপূরণ দিতে হবে প্রায় ৭ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা

বিচারক রায়ে আরও বলেন, “এই নিরস্ত্র শ্রমিকেরা কেবল উন্নত কর্মপরিবেশের দাবি জানিয়েছিলেন। তারা কোনো সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তবুও তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।”

আদালত ব্রিটিশ সরকারকে শুধু ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশই দেননি, নিহত শ্রমিকদের পরিবারগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন।

নাইজেরিয়া সরকারের ব্যর্থতাও উল্লেখ

রায়ে আরও বলা হয়, নিহত শ্রমিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নাইজেরিয়া সরকারও তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

এই মামলায় ব্রিটিশ সরকার কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং আদালতের শুনানিতে তাদের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।

ভুক্তভোগীদের পক্ষে মামলাটি পরিচালনাকারী আইনজীবীরা রায়টিকে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেছেন। আবেদনকারীদের অন্যতম আইনজীবী ইয়েমি আকিনসেই-জর্জ বলেন, “এই রায় ঔপনিবেশিক যুগের অপরাধের জন্য জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের একটি শক্ত বার্তা। এটি প্রমাণ করে যে জীবনের অধিকার সময়, সীমান্ত বা রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে।”

এই রায়কে নাইজেরিয়ার ইতিহাসে ঔপনিবেশিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি স্বীকৃতিগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

০%
০%
০%
০%