ব্যাটারি বদল জটিলতা ও রিমোট লক সমস্যায় কেনিয়ায় ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল চালকদের ক্ষোভ

কেনিয়ায় ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে দিন দিন অসন্তোষ বাড়ছে। ব্যাটারি বদল ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, এক কোম্পানির ব্যাটারি অন্য কোম্পানির নেটওয়ার্কে ব্যবহার করতে না পারা এবং নির্দিষ্ট সময় মোটরসাইকেল ব্যবহার না হলে দূর থেকে লক করে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে সরব হয়েছেন জনপ্রিয় পডকাস্টার ও রেডিও উপস্থাপক ফ্রান্সিস কিবে ন্জেরি।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ন্জেরি দাবি করেন, কিছু ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল কোম্পানির রিমোট লক ব্যবস্থা চালকদের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলছে। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই মোটরসাইকেল অচল হয়ে যায়, ফলে যেসব চালক পরিবহন বা ডেলিভারি সেবার মাধ্যমে সংসার চালান, তারা বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে তিনি উন্মুক্ত ও অভিন্ন ব্যাটারি ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এই খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে অ্যাম্পারস্যান্ড, আর্ক রাইড ও রোমের মতো প্রতিষ্ঠান। মহাদেশের সবচেয়ে বড় ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল কোম্পানি স্পিরোর তথ্য অনুযায়ী, তারা বর্তমানে বারো শতাধিক ব্যাটারি চার্জ ও বদল কেন্দ্র পরিচালনা করছে এবং প্রায় ষাট হাজার ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল রাস্তায় নামিয়েছে।

চালকদের অভিযোগ, মোটরসাইকেল কিনলেও ব্যাটারির মালিকানা কোম্পানির কাছেই থেকে যায়। ফলে তারা শুধু নির্দিষ্ট কোম্পানির স্টেশনেই ব্যাটারি বদলাতে বাধ্য হন এবং বাসায় চার্জ দেওয়ার সুযোগ পান না। ন্জেরির ভাষায়, এটি চালকদের জন্য ন্যায্য ব্যবস্থা নয়।

রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ

এই ক্ষোভ থেকেই গত নভেম্বরে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি ও উপকূলীয় শহর মোম্বাসায় শত শত ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল চালক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। তারা ব্যাটারি বদল কেন্দ্র বাড়ানো এবং সব নেটওয়ার্কে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

নাইরোবির এক চালক অস্কার ওকিতে বলেন, ব্যাটারি বদলের জায়গা না পেলে প্রতিবার তাকে প্রায় পাঁচশ কেনিয়ান শিলিং সমপরিমাণ অর্থ ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। তার মতে, শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, দেশের সব জায়গায় কার্যকর ব্যাটারি নেটওয়ার্ক প্রয়োজন।

লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল সাধারণত পেট্রোলচালিত মোটরসাইকেলের তুলনায় খরচে সাশ্রয়ী। কোম্পানিগুলোর দাবি, বিদ্যুৎ সস্তা হওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণ কম লাগায় চালকেরা দৈনিক পরিচালন ব্যয়ে প্রায় চল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারেন। তবে ব্যাটারি বদল কেন্দ্রের স্বল্পতা এই সুবিধাকে অনেক ক্ষেত্রে সীমিত করে দিচ্ছে।

বন্ধ ব্যবস্থায় আটকে ইলেকট্রিক পরিবহন খাত

বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার অধিকাংশ ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল কোম্পানি নিজেদের জন্য আলাদা ও বন্ধ ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এতে একেক কোম্পানির মোটরসাইকেল, ব্যাটারি ও চার্জিং অবকাঠামো কেবল তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্কেই কার্যকর থাকে।

আফ্রিকা বৈদ্যুতিক পরিবহন জোটের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব আফ্রিকায় বর্তমানে ঊননব্বইটিরও বেশি বৈদ্যুতিক পরিবহন কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ছেচল্লিশটি, পশ্চিম আফ্রিকায় ঊনচল্লিশটি এবং উত্তর আফ্রিকায় উনিশটি কোম্পানি কাজ করছে। বিনিয়োগের দিক থেকেও পূর্ব আফ্রিকা এগিয়ে রয়েছে, যেখানে প্রায় দুইশ সাত মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে।

ওয়াতু আফ্রিকার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক এরিক সুই বলেন, চার্জিং ও ব্যাটারি বদল কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই এই খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। তার মতে, এমন অনেক কেন্দ্র আছে, যেগুলো সব চালকের জন্য ব্যবহারযোগ্য নয়—এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি।

কোম্পানিগুলোর যুক্তি

ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল কোম্পানিগুলো বলছে, নেটওয়ার্ক ভাগাভাগি করা প্রয়োজন হলেও বিষয়টি বাস্তবে জটিল। একটি ব্যাটারি বদল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ব্যাটারি ও স্টেশন ছাড়াও জমি, নিরাপত্তা, সফটওয়্যার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল বিনিয়োগ লাগে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাটারির আকার, নিরাপত্তা মান ও অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা একীভূত করাও কঠিন।

স্পিরোর প্রধান নির্বাহী কৌশিক বর্মন বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তারা নেটওয়ার্ক ভাগাভাগির বিষয়ে আগ্রহী। তবে যথাযথ পরীক্ষা ও অনুমোদন ছাড়া যেকোনো ব্যাটারিকে যেকোনো স্টেশনে ব্যবহার করতে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পরিবর্তনের আভাস

এর মধ্যেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে অ্যাম্পারস্যান্ড। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা দেয়, তারা তাদের ব্যাটারি বদল নেটওয়ার্ক অন্যান্য ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল নির্মাতার জন্য উন্মুক্ত করবে। এটি আফ্রিকায় প্রথম এমন উদ্যোগ।

অ্যাম্পারস্যান্ডের প্রধান নির্বাহী জশ হোয়েল বলেন, এই উন্মুক্ত ব্যবস্থার ফলে নতুন নির্মাতারা আলাদা চার্জিং অবকাঠামো ছাড়াই বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। কেনিয়া ও রুয়ান্ডায় ইতোমধ্যে অন্যান্য কোম্পানির মোটরসাইকেল এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার শুরু করেছে।

তবে চালকদের মতে, এই পরিবর্তন আরও আগেই হওয়া প্রয়োজন ছিল। নাইরোবির চালক কেভিন মাচারিয়া বলেন, সময়মতো ব্যাটারি বদলাতে না পারলে তাদের আয় কমে যায়। তার ভাষায়, ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলে আসার উদ্দেশ্য ছিল বেশি আয় করা, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা নয়।

০%
০%
০%
০%