নাইজেরিয়ায় জঙ্গি সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, নতুন হটস্পটে রক্তক্ষয়

ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে নাইজেরিয়া এখন গভীর নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের একটি রাজ্যে সাম্প্রতিক হামলায় অন্তত ১৬২ জন নিহত হয়েছেন, যা এই অঞ্চলে সহিংসতার নতুন ও ভয়াবহ অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, মঙ্গলবার কাওয়ারা রাজ্যের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রাম ওরো ও নুকু -তে এই হামলা চালানো হয়। নিহতদের অধিকাংশকে চরমপন্থী মতাদর্শ প্রত্যাখ্যান করার কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলাকারীরা ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয় এবং বাজার ও দোকানপাট লুট করে।

হামলার কয়েক দিন পরও ওরো গ্রামে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ও বাজারের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

এই হামলা কাওয়ারাসহ নাইজেরিয়ার অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সাম্প্রতিক সহিংসতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতার অংশ, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা সম্প্রতি জোরদার করা হয়েছে।

অপহৃত ১৮৩ খ্রিস্টান মুক্ত

এদিকে, বৃহস্পতিবার কাদুনা রাজ্যের গভর্নর ঘোষণা দেন, গত মাসে গির্জা থেকে অপহৃত সব ১৮৩ জন খ্রিস্টান এখন মুক্ত। কীভাবে তাদের মুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।

সরকারবিরোধী লড়াইয়ে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর জোটের আশঙ্কা

নাইজেরিয়া বর্তমানে বহু সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশীয় ইসলামপন্থী সংগঠন বোকো হারাম , তাদের ভাঙনধারী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স , ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট লাকুরাওয়া এবং মুক্তিপণের জন্য অপহরণ ও অবৈধ খননকাজে জড়িত বিভিন্ন ‘ব্যান্ডিট’ গোষ্ঠী।

সম্প্রতি এই সংকট আরও জটিল হয়েছে প্রতিবেশী সাহেল অঞ্চল থেকে আসা জঙ্গিদের কারণে। এর মধ্যে জামা’আত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন গত বছর নাইজেরিয়ার মাটিতে প্রথম হামলার দায় স্বীকার করে।

বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর নাইজেরিয়ায় সামরিক অভিযানের চাপ এবং গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ায় তারা নতুন এলাকা—বিশেষ করে দুর্গম বনাঞ্চলঘেরা কাওয়ারার মতো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।

গুড গভর্ন্যান্স আফ্রিকার নিরাপত্তা গবেষক মালিক স্যামুয়েল বলেন,
“এই গোষ্ঠীগুলো তাদের অভিন্ন শত্রু—রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়তে একত্রিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।”

নিরাপত্তা সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা

নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, যদিও দুই দেশের মধ্যে আগে কিছু কূটনৈতিক উত্তেজনা ছিল। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকা কমান্ড -এর প্রধান জানান, গোয়েন্দা সহায়তার জন্য অল্পসংখ্যক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা নাইজেরিয়ায় অবস্থান করছেন।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাইজেরিয়ায় খ্রিস্টানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগ তুলে দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের হুমকি দেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তর নাইজেরিয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলায় নিহতদের বেশিরভাগই মুসলিম।

পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও নাইজেরিয়ার মধ্যে সম্পর্কের উত্তেজনা কমে আসে এবং দুই দেশ নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করে। গত ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র নাইজেরিয়ায় ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট জঙ্গিদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়।

নাইজেরিয়া সরকার গত মাসে জানায়, মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগে দীর্ঘদিন আটকে থাকা দেশটির কেনা সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্র সম্মতি দিয়েছে।

কাওয়ারা জঙ্গিদের নতুন বিস্তারক্ষেত্র

কাওয়ারা রাজ্যের গভর্নর আবদুলরাহমান আবদুলরাজাক বলেন, মঙ্গলবারের হামলাটি সম্ভবত সাম্প্রতিক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রতিক্রিয়া। এসব অভিযানের কিছু স্থানীয় জনগণের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে।

এলাকার ফেডারেল আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ ওমর বায়ো এই হামলার জন্য লাকুরাওয়া গোষ্ঠীকে দায়ী করেন। তার দাবি, ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর ওই গোষ্ঠীর কিছু সদস্য কাওয়ারার মতো অঞ্চলে পালিয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রাণঘাতী হামলা ও অপহরণ বেড়ে যাওয়ায় কাওয়ারা দ্রুত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নতুন বিস্তারক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে।


০%
০%
০%
০%