Advertisement

গাজায় যুদ্ধবিধ্বস্ত জীবনে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে দিশেহারা ৫০ হাজারের বেশি বিধবা নারী

গাজার উত্তরাঞ্চলে তীব্র দাবদাহের মধ্যে একটি জীর্ণ তাঁবুর নিচে প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন মোনা আল-মাসরি। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া ইসরায়েলি বাহিনীর ভয়াবহ যুদ্ধের বলি হয়ে গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রাণ হারিয়েছেন তার স্বামী মোহাম্মদ। চার সন্তান নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে আটকে পড়া মোনা এখন জীবনযুদ্ধে একা। গৃহহীন হওয়ার যন্ত্রণার চেয়েও তাকে বেশি দগ্ধ করছে একাকী সংসারের হাল ধরার অমানবিক চাপ। তাঁবুর ভেতরে কোনো স্বাভাবিক জীবনের চিহ্ন নেই, বরং প্রতিটি ভোর নিয়ে আসে অন্ন ও আশ্রয়ের দুশ্চিন্তা।

গাজার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উপত্যকায় বিধবা নারীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধের কারণে স্বামী হারিয়েছেন ২৮ হাজার ২২৪ জন নারী, আর যুদ্ধের আগে থেকেই নিবন্ধিত ছিলেন ২২ হাজার ৫০০ জন। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আজিজা আল-কাহলৌত জানিয়েছেন, অঘোষিত অনেক বিধবা এখনো হিসাবের বাইরে থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ও সহায়-সম্বলহীনতার কারণে এই নারীরা আজ চরম দারিদ্র্য ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

আজিজা আল-কাহলৌত জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল আর্থিক সহায়তাই এই নারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তাদের প্রয়োজন সামাজিক সুরক্ষা, আইনি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের পুনর্বাসন। পারিবারিক উত্তরাধিকার, সন্তানের অভিভাবকত্ব ও ভরণপোষণের মতো আইনি জটিলতাগুলো নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই পরিবারের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। এছাড়া অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য কর্মসংস্থান ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

মনোবিজ্ঞানী আসিল আবু শাভেশ মনে করেন, যুদ্ধক্ষেত্রে স্বামী হারানোর বেদনা কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। সন্তানকে আগলে রাখতে গিয়ে অনেক মা নিজেদের চোখের জল লুকিয়ে প্রতিনিয়ত মানসিক অবসাদ ও তীব্র উদ্বেগের শিকার হচ্ছেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় শিশুরা তাদের বাবার পাশাপাশি হারিয়ে ফেলছে জীবনের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা, যার ফলে তাদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী ভীতি ও আচরণগত পরিবর্তন।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার এই নারীদের টিকে থাকার লড়াইকে বেগবান করতে প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী সহায়তা কর্মসূচি। কেবল ত্রাণ দিয়ে নয়, বরং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বেঁচে যাওয়া এই বিধবা ও তাদের এতিম সন্তানদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করা গেলে মানবিক বিপর্যয় আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%