জেরিকোতে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা

অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেরিকো শহরের উপকণ্ঠে ফিলিস্তিনিদের মালিকানাধীন বাগান ও আবাসন এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের পরিকল্পিত উচ্ছেদ অভিযান ও বুলডোজারের তাণ্ডবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে অসংখ্য পরিবার। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে, কোনো আইনি নোটিশ ছাড়াই জোরপূর্বক তাদের বসতভিটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং এর পেছনে সরাসরি মদত দিচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী।
গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে হানান হার্বস্ট নামের এক বসতি স্থাপনকারীর নেতৃত্বে এই ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে। হার্বস্টের পরিচালিত ‘আরমোনট ফার্ম’ নামক অবৈধ স্থাপনাটিকে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা চলতি বছরের মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈধতা প্রদান করে। এখন হার্বস্টের বুলডোজারগুলো ‘বর্জ্য পরিষ্কারের’ অজুহাতে প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় তাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
আক্রান্ত এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সালাহ জানান, তার নিজের বাড়িতে যাওয়ার পথ এখন ধ্বংসস্তূপ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হার্বস্টের পক্ষ থেকে তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বাড়ি ফেরার পথ না থাকলে অন্য কোনো বিকল্প খুঁজতে, কারণ এই জমি আর ফিলিস্তিনিদের অধিকারে নেই। একই পরিস্থিতির শিকার ষাটোর্ধ্ব খলিল আল-রাজিম। তিনি গত এক দশক ধরে এখানে গ্রীষ্মকালীন আবাস গড়ে তুলেছিলেন, কিন্তু এখন সেখানে কেবল ইট-পাথরের স্তূপ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো বড় ধরনের হামলার শিকার হয় এই এলাকা। মুখোশধারী বসতি স্থাপনকারীরা বেদুইন পরিবারসহ স্থানীয়দের ওপর হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয় এবং গবাদি পশু লুট করে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকে এলাকাটি এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে ছিল। সম্প্রতি ইসরায়েলি সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন হার্বস্টকে ‘নির্মাণ বর্জ্য’ পরিষ্কারের অনুমতি দেওয়ার পর থেকে নতুন করে ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে। আইনজীবী তৌফিক জাবারিন জানান, ইসরায়েলি আদালত অতীতে এই স্থাপনাগুলোকে রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও সামরিক বাহিনী সরাসরি আদালতের আদেশ লঙ্ঘন করে বসতি স্থাপনকারীদের মাধ্যমে উচ্ছেদ কার্যক্রম চালাচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, এটি কেবল ভূমি দখলের লড়াই নয়, বরং এক ধরনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। হাশমোনিয়ান ও হেরোডিয়ান রাজপ্রাসাদের নিকটবর্তী এই এলাকাটিকে ইসরায়েল তাদের ‘ইহুদি ঐতিহ্যের’ অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। হেরিটেজ মন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহু এর আগে এই এলাকায় ইহুদি ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের নামে ফিলিস্তিনি স্থাপনা ধ্বংসের হুমকি দিয়েছিলেন। সেই হুমকির প্রতিফলন হিসেবেই এখন বুলডোজার দিয়ে বসতিগুলো মাটির নিচে চাপা দেওয়া হচ্ছে।
পরিবারগুলোকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করার পর মোহাম্মদ সালাহ বর্তমানে বেথলেহেম শহরে ২ হাজার শেকল ভাড়ায় একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে বাস করছেন। তার সন্তানদের সামনে নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, জীবনের শুরুতে সন্তানদের শিখিয়েছিলাম যে কোনো ঝামেলায় না জড়াতে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাদের সেই বিশ্বাসকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। বসতি স্থাপনকারীদের পেশিশক্তির কাছে আজ অসহায় সাধারণ ফিলিস্তিনিরা, যারা নিজ ভিটা হারানোর বেদনায় এখন দিশেহারা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
