Advertisement

সোশ্যাল মিডিয়ায় ফিলিস্তিনি কণ্ঠস্বর দমনে মেটার বিরুদ্ধে কাঠামোগত প্রচারণার অভিযোগ

ফিলিস্তিনিদের ডিজিটাল অধিকার হরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার নেপথ্যে মেটার কাঠামোগত তৎপরতার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে এক নতুন গবেষণায়। ফিলিস্তিনি এনজিও ‘সামলাহ’ এবং ইউট্রেখ্ট ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণায় গত পাঁচ বছরে ফিলিস্তিনি ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল অধিকার লঙ্ঘনের ৩ হাজার ৫২০টি ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে মেটার এ ধরনের আচরণকে ‘প্ল্যাটফর্মিাইড’ বা ডিজিটাল অস্তিত্ব মুছে ফেলার পরিকল্পিত প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

জেরুজালেমভিত্তিক সাংবাদিক ফাতেন এলওয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন। অথচ বর্তমানে তাঁর তিন লক্ষাধিক অনুসারীর প্ল্যাটফর্মে পোস্টগুলো মাত্র কয়েকশ ভিউ পাচ্ছে। মেটার অ্যালগরিদমের এই অদৃশ্য কারসজি বা ‘শ্যাডো-ব্যানিং’-এর শিকার হয়ে তিনি এখন যেন ডিজিটাল জগতে অস্তিত্বহীন। এলওয়ান জানান, মেটা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি, যা প্রমাণ করে প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক পর্যায়ে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছে।

বিজ্ঞাপন

ইউট্রেখ্ট ইউনিভার্সিটির গবেষক ফ্যাবিও ক্রিস্টিয়ানো বলছেন, মেটার এই পদক্ষেপগুলোকে নিছক প্রযুক্তিগত ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি কাঠামোগত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কৌশল, যা কেবল কনটেন্ট মডারেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নথিবদ্ধ ঘটনার মাত্র ৩২.৫ শতাংশের ক্ষেত্রে নীতি লঙ্ঘনের নির্দিষ্ট কারণ দর্শানো হয়েছে। বাকি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারীরা কোনো ব্যাখ্যা পাননি।

বিশেষ করে সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের ক্ষেত্রে মেটার ‘ডেঞ্জারাস অর্গানাইজেশনস অ্যান্ড ইনডিভিজুয়ালস’ বা ডিওআই নীতির অপপ্রয়োগ সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমগুলো যখন গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের তথ্য বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে চায়, ঠিক তখনই তাদের অ্যাকাউন্ট সাময়িক স্থগিত বা ফিচার সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজাবাসী সাংবাদিকদের জন্য এই প্ল্যাটফর্মগুলো বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল, যা এখন প্রায় অকার্যকর।

বিজ্ঞাপন

এই ডিজিটাল সেন্সরশিপের কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে একধরনের ভীতি ও আত্ম-সেন্সরশিপ তৈরি হয়েছে। কুদস নিউজ নেটওয়ার্কের প্রধান সম্পাদক ইউসেফ আবু ওয়াতফা জানান, গাজার বাস্তব চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মেটা প্রতিনিয়ত বাধা সৃষ্টি করছে। এমনকি জাতিসংঘের বার্কলি প্রোটোকল অনুযায়ী, গাজার যুদ্ধ পরিস্থিতির যে তথ্য-প্রমাণগুলো ভবিষ্যতে যুদ্ধের অপরাধ বিচারের দলিল হতে পারত, মেটার কনটেন্ট ডিলিট প্রক্রিয়ায় সেগুলোও চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে মেটার পক্ষ থেকে দায়সারা প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়েছে। তারা দাবি করেছে, আরবি উপভাষার সঠিক বোঝাপড়ার জন্য তারা নতুন মডারেটর সিস্টেম চালু করেছে এবং নীতিমালা সংশোধন করেছে। তবে সামলাহ-এর তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে তারা মেটার কাছে ২ হাজার ৮২৮টি আবেদন জানালেও প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে কোনো উত্তর পায়নি। ডিজিটাল অধিকারকর্মী লামা নাজিহ মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব ডকুমেন্ট করার অধিকার কোনো একটি বেসরকারি কোম্পানির মর্জির ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। এখন সময় এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর স্বেচ্ছাধীন নীতিমালার বদলে আন্তর্জাতিকভাবে বাধ্যতামূলক আইনি কাঠামো নিশ্চিত করার।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%