Advertisement

দেশভাগের দগদগে ক্ষত নিয়ে মুক্তি পেল রাজকুমার সন্তোষীর বাটওয়ারা ১৯৪৭

১৯৪৭ সালের দেশভাগের ক্ষতচিহ্ন ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মজ্জায় মিশে আছে। এই ঐতিহাসিক বিচ্ছেদ কেবল মানচিত্রের সীমানা নির্ধারণ করেনি, বরং লাখো মানুষের আবেগ, অস্তিত্ব আর পরিচয়ের সংকট তৈরি করেছে। সেই চিরন্তন বেদনা ও সংগ্রামের গল্প নিয়েই আজ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে রাজকুমার সন্তোষী পরিচালিত বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘বাটওয়ারা ১৯৪৭’। সানি দেওল, প্রীতি জিনতা, শাবানা আজমি এবং করন দেওলের মতো তারকাবহুল এই ছবিটি ভারতের স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে দেশভাগের উত্তাল সময়ে লাহোরের একটি পুরোনো হাভেলিকে কেন্দ্র করে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া একটি মুসলিম পরিবারের সাথে বাড়ির আদি মালিক এক বৃদ্ধা হিন্দু নারীর মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্বের সংঘাতের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে বিভাজনের বৃহত্তর ট্র্যাজেডি। দীর্ঘ বিরতির পর পর্দায় ফেরা প্রীতি জিনতা এখানে গৃহবধূ হামিদার চরিত্রে এক বলিষ্ঠ অভিনয় করেছেন, যিনি চরম সংকটেও নিজের পরিবারকে আগলে রাখার লড়াকু মানসিকতা প্রদর্শন করেছেন। আমির খান প্রযোজিত এই সিনেমাটি দর্শককে আবারও প্রশ্ন করতে বাধ্য করবে—সাত দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও কেন বারবার সেলুলয়েডে ফিরে আসে দেশভাগের সেই করুণ আখ্যান?

বিজ্ঞাপন

বলিউডের পর্দায় দেশভাগ কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে ‘গরম হাওয়া’, ‘তমস’, ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’, ‘আর্থ’, ‘পিঞ্জর’ কিংবা ‘গদর’-এর মতো কালজয়ী সিনেমাগুলো প্রমাণ করেছে যে, এই বিষয়টি কেবল ইতিহাসের পাতা নয়, বরং বর্তমানের সাথেও নাড়ির টান বজায় রেখেছে। এম এস সত্যুর ‘গরম হাওয়া’ দেশভাগকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছিল, যেখানে বলরাজ সাহনির অসাধারণ অভিনয় আজও অম্লান। অন্যদিকে, ‘তমস’ বা ‘পিঞ্জর’ দেশভাগের সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প এবং নারীর অসহায়ত্বের এক অমোঘ দলিল হয়ে আছে।

সময় পাল্টেছে, কিন্তু গল্পের আবেদন কমেনি। ইমতিয়াজ আলীর সাম্প্রতিক কাজ ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ সেই ধারাবাহিকতায় এক নতুন সংযোজন। যেখানে স্মৃতিভ্রংশ এক বৃদ্ধের হারানো প্রেমের অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে দেশভাগের ব্যক্তিগত ক্ষত। বর্তমান প্রজন্মের কাছে দেশভাগ কেবল পাঠ্যবইয়ের ঘটনা নয়, বরং এটি পূর্বপুরুষের ফেলে আসা বাড়ির স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের আর্তনাদ আর শেকড়ের প্রতি তীব্র টান।

বিজ্ঞাপন

কেন বলিউড বারবার এই ক্ষত খোঁড়ার সাহস পায়? কারণ, দেশভাগের গল্পে রাজনীতি আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে মানুষের টিকে থাকার লড়াই। এটি কেবল ঘৃণা বা রাজনীতির আখ্যান নয়, বরং এটি প্রেম, বিচ্ছেদ এবং অস্তিত্বের লড়াইয়ের এক মহাকাব্য। মানচিত্রে দেশভাগ ১৯৪৭ সালেই সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু মানুষের মনের গভীরে চলা এই বিভাজনের ঢেউ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নতুন নতুন আঙ্গিকে ফুটে উঠছে। ‘বাটওয়ারা ১৯৪৭’ সেই অবিনশ্বর স্মৃতিরই এক নতুন দলিল।

0%
0%
0%
0%