জিম্বাবুয়েতে দুই দশকের পুরোনো ভূমি সংস্কার নিয়ে নতুন বিতর্ক ও মালিকানা পুনর্বহালের উদ্যোগ

জিম্বাবুয়ের ভূমি সংস্কার কার্যক্রমের দুই দশকেরও বেশি সময় পর নতুন এক নীতিমালার মাধ্যমে ফের হাতবদল হতে যাচ্ছে দেশটির হাজার হাজার বাণিজ্যিক খামার। ২০০০ সালের পর রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া এসব জমির মালিকানা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট এমারসন মানগাওয়া প্রশাসন অবশ্য দাবি করেছে, এই পদক্ষেপ কোনোভাবেই সেই ঐতিহাসিক ভূমি পুনর্বণ্টন কর্মসূচির উল্টো যাত্রা নয়, বরং অমীমাংসিত জটিলতা নিরসনের একটি প্রয়াস।
দেশটির কৃষিমন্ত্রী এনক্সাস মাসুকা পার্লামেন্টে জানান, দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির আওতায় থাকা ৬৭টি খামার ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডের বিনিয়োগকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভুলবশত রাষ্ট্রের অধিগ্রহণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া ৮৪০টি খামার প্রকৃত কৃষ্ণাঙ্গ মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া, জিম্বাবুয়েতে অবস্থানরত ৪০৯ জন শ্বেতাঙ্গ কৃষককে তাদের দখলে থাকা জমিগুলো ক্ষতিপূরণ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেনার সুযোগ দিচ্ছে সরকার।
জিম্বাবুয়ের রাজনীতিতে ভূমি ইস্যুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ঔপনিবেশিক আমলের অবসান ও স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ২০০০ সালে দ্রুত ভূমি সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার শ্বেতাঙ্গ মালিকানাধীন খামারগুলো অধিগ্রহণ শুরু করে। সেই সময়ে এই প্রক্রিয়া ব্যাপক সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বিতর্কিত হয়ে পড়েছিল। এই বিশৃঙ্খলা দেশটির বাণিজ্যিক কৃষিখাতকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের বর্তমান এই উদ্যোগ কেবল ঐতিহাসিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নয়, বরং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের আস্থা অর্জনের একটি কৌশল। জিম্বাবুয়ে বর্তমানে ঋণের বোঝা লাঘব এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। যদিও সরকার দাবি করছে যে ভূমি সংস্কার অপরিবর্তনীয়, তবে সাবেক মালিকদের একাংশ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নিজেদের হারানো সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার আশায় নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন।
তবে এই নতুন নীতি নিয়ে খোদ জিম্বাবুয়ের ভেতরেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। যারা একসময় ভূমি সংস্কারের পক্ষে আন্দোলন করেছিলেন এবং খামার দখল প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই এখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন। সাবেক যোদ্ধারা আশঙ্কা করছেন, রাষ্ট্র হয়তো তাদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত অর্জনগুলো বিসর্জন দিচ্ছে। অন্যদিকে, আইনি জটিলতার গ্যাঁড়াকলে পড়ে যারা তাদের পৈতৃক সম্পত্তি হারিয়েছিলেন, তাদের জন্য এই নীতিমালা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, এই প্রক্রিয়াটি ২০২০ সালে সাবেক বাণিজ্যিক কৃষকদের জন্য গৃহীত ৩৫ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমান সরকার ভূমি সংস্কারের সুবিধাভোগীদের জমির মালিকানার আইনি সনদ প্রদানের মাধ্যমেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে। তবে দুই দশক পেরিয়ে গেলেও জিম্বাবুয়ের ভূমি সংক্রান্ত এই অমীমাংসিত বিরোধ দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর জটিলতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
