পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস নিয়ে উত্তাল ভারত: মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় বিক্ষোভকারীরা, নীরব মোদি সরকার

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলমান নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির জেরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে ভারত। যুবসমাজের নেতৃত্বে চলমান এই আন্দোলন গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত রয়েছে। গত সোমবার পুলিশি লাঠিপেটা ও টিয়ার গ্যাসের আঘাতে শতাধিক বিক্ষোভকারী আহত হওয়ার ঘটনাটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টানা তৃতীয় মেয়াদের শাসনামলে জনরোষের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
প্রধান বিরোধী দলগুলো এই বিক্ষোভে সংহতি জানিয়ে রাজপথে নেমে এসেছে এবং ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণের দাবি জোরালো করেছে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনরোষ বা বিতর্কিত পরিস্থিতির মুখে মন্ত্রীদের পদত্যাগ করা বা বরখাস্ত হওয়ার নজির থাকলেও, মোদির দীর্ঘ ১২ বছরের শাসনামলে এর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের চাপের মুখে মন্ত্রীদের রক্ষা করা মোদির দীর্ঘস্থায়ী একটি রাজনৈতিক কৌশল।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তরপ্রদেশের দাদরির বিশাদা গ্রামে মোহাম্মদ আখলাক নামের এক ব্যক্তিকে গরু চুরির সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর তৎকালীন সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী মহেশ শর্মা এটিকে একটি ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে অভিহিত করলে দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সে সময় তাঁর পদত্যাগের দাবি উঠলেও মোদি সরকার তা কর্ণপাত করেনি। বরং পরবর্তীতে মহেশ শর্মাকে খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির মরদেহে জাতীয় পতাকা মুড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাতে দেখা গেছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চরম বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।
২০১৬ সালে হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে দলিত ছাত্র রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যার ঘটনাটিও একই ধরণের বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অন্যায় সিদ্ধান্তের নেপথ্যে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি এবং বান্দারু দত্তাত্রেয়ের ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের পর উত্তাল পরিস্থিতিতেও স্মৃতি ইরানি বা দত্তাত্রেয়কে মন্ত্রিসভা থেকে সরাননি মোদি। উল্টো স্মৃতি ইরানিকে পরবর্তীতে আরও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং দত্তাত্রেয়কে গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
একইভাবে, ২০২১ সালে লখিমপুর খেরিতে কৃষকদের ওপর গাড়ি চালিয়ে হত্যার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্র টেনির নাম জড়ানোর পরেও তিনি তিন বছর স্বপদে বহাল ছিলেন। মোদির শাসনামলে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল করোনাকালীন বিপর্যয়, যখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। যদিও পরবর্তীকালে নির্বাচনের টিকিট না দিয়ে তাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মোদি সরকারের এই অনড় অবস্থানকে তার পূর্বসূরি কংগ্রেসের শাসনকালের সঙ্গে তুলনা করছেন রাজনৈতিক সমালোচকরা। তৎকালীন সরকারের আমলে বড় ধরনের বিতর্ক বা জনদাবির মুখে বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব ছাড়তে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে মোদি সরকার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য এবং একক কর্তৃত্বকেই অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা