খেলাপি ঋণ কমাতে বড় ছাড় দিল বাংলাদেশ ব্যাংক, সুদ মওকুফে শর্ত শিথিল

দেশের ব্যাংকিং খাতে পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণের বোঝা লাঘব এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ সচল করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক যুগান্তকারী ‘এক্সিট সুবিধা’ বা এককালীন দায়মুক্তি নীতি ঘোষণা করেছে। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, এখন থেকে খেলাপি গ্রাহকরা তাদের বকেয়া ঋণের মূল অর্থ এককালীন পরিশোধের মাধ্যমে দায়মুক্ত হতে পারবেন। এই প্রক্রিয়ায় গ্রাহকের আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কঠোর শর্তগুলো শিথিল করা হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর আদায় অযোগ্য ঋণের পরিমাণ কমিয়ে নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ দেশের ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদ গুণগত মানকে চাপের মুখে রেখেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ব্যাংক খাতের এই স্থবিরতা নিরসনে এমন বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যেন সংকট কাটিয়ে ওঠা উদ্যোক্তারা পুনরায় ব্যবসার মূলধারায় ফিরতে পারেন। যেসব ঋণগ্রহীতা সাময়িক আর্থিক সংকটে থাকলেও ব্যবসা পরিচালনায় সক্ষম এবং ঋণের দায় পরিশোধে আন্তরিক, মূলত তাদেরই এই বিশেষ সুবিধার আওতায় আনা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ সুগম হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত মন্দ বা ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত ঋণ এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের ভিত্তিতে এবং ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের নিরিখে এই সুবিধা প্রদান করতে হবে। এর আগে সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ব্যাংকের ‘কস্ট অব ফান্ড’ বা তহবিল ব্যয় আদায়ের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা এবার শিথিল করা হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর আয় খাত বিকলন না করার শর্তটিও তুলে নেওয়া হয়েছে, যার ফলে সব ব্যাংক এখন সমানভাবে সুদ মওকুফের মাধ্যমে খেলাপি গ্রাহককে এক্সিট সুবিধা দিতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুনের মধ্যে যেসব মন্দ ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, সেগুলোও এই বিশেষ সুবিধার আওতায় আসবে। এছাড়া কৃষি খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং সিএমএসএমই খাতের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর অধীনে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারিকৃত এই বিশেষ নীতিমালার মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদার নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
