যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যকর আয়ুষ্কালে অবনতি

যুক্তরাজ্যে জনস্বাস্থ্যের ভয়াবহ অবনতি ঘটছে, যা স্থূলতার সংকট, প্রায় ২৮ লাখ কর্মক্ষম ব্রিটিশ নাগরিকের অসুস্থতার কারণে কাজ করতে অক্ষমতা এবং মানসিক রোগের ক্রমবর্ধমান ব্যাপকতার মাধ্যমে স্পষ্ট। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত এক দশকে দেশটির সুস্থ জীবন প্রত্যাশা দুই বছর কমেছে। হেলথ ফাউন্ডেশন এবং অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকসের (ওএনএস) তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির এক নতুন ও অস্বস্তিকর চিত্র তুলে ধরেছে, যা সরকারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষা উভয় লক্ষ্যেই গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
হেলথ ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, সুস্থ জীবন প্রত্যাশা বলতে বোঝায় একজন মানুষ অসুস্থতা বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই কত বছর সুস্থ জীবন যাপন করতে পারে। এটি কেবল মানুষের আয়ুষ্কাল পরিমাপ না করে জীবনের গুণগত মানকেও বিবেচনা করে, যা একটি জাতির সার্বিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও ব্যাপক ধারণা দেয়। ব্যথা, অস্ত্রোপচার, চিকিৎসার প্রয়োজন বা নিয়মিত ঔষধ সেবন ছাড়া কেউ যত দীর্ঘ সময় বাঁচতে পারে, তার জীবন তত উন্নত বলে বিবেচিত হয়।
বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে অন্যান্য ধনী দেশগুলিতে, সুস্থ জীবন প্রত্যাশা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। হেলথ ফাউন্ডেশনের গবেষণা অনুযায়ী, গত এক দশকে এই দেশগুলোতে সুস্থ জীবন প্রত্যাশা গড়ে প্রায় ০.৪ বছর বেড়েছে, যদিও তা ছিল সামান্য।
তবে যুক্তরাজ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০১২-১৪ সাল থেকে ২০২২-২৪ সালের মধ্যে দেশটির সামগ্রিক জনসংখ্যায় সুস্থ জীবন প্রত্যাশা দুই বছর কমে দাঁড়িয়েছে পুরুষদের জন্য ৬০.৭ বছর এবং মহিলাদের জন্য ৬০.৯ বছর। হেলথ ফাউন্ডেশন উল্লেখ করেছে যে, ২০২২-২৪ সালে অধিকাংশ এলাকায় সুস্থ জীবন প্রত্যাশা বর্তমান সরকারি পেনশন পাওয়ার বয়স ৬৬ বছরের নিচে রয়েছে। এর অর্থ হলো, অনেক মানুষ অবসর গ্রহণের আগেই অসুস্থতার সঙ্গে জীবনের কিছু বছর কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
দেশের দরিদ্রতম অঞ্চলগুলিতে সুস্থ জীবন প্রত্যাশা ৫৫ বছরেরও কম। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, এসব অঞ্চলের বহু মানুষ তাদের কর্মক্ষম বয়সেই অসুস্থতার শিকার হচ্ছেন, যা তাদের জীবন ও জীবিকার উপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ডাউনিং স্ট্রিট এই তথ্যকে অত্যন্ত ভীতিকর মনে করছে। সরকার একদিকে এনএইচএস-কে ক্রমবর্ধমান সেবার চাহিদা থেকে বাঁচাতে এবং আয়ের অভাবে হারানো কর রাজস্বের কারণে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে পুনরুদ্ধার করতে চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রধান লক্ষ্যও তাদের। এর পূর্ববর্তী সরকারগুলো পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি, যার ফলস্বরূপ একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজস্ব প্রভাবের পাশাপাশি মানবসম্পদের ওপরও বিশাল মূল্য চোকাতে হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের সুস্থ জীবন প্রত্যাশার এই দুই বছরের পতন প্রমাণ করে যে, দেশটি বেশিরভাগ তুলনামূলক উচ্চ আয়ের দেশের প্রবণতা থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত বহু প্রতিরোধযোগ্য অসুস্থতা এর অন্যতম কারণ। উদাহরণস্বরূপ, প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যান্সার প্রতিরোধযোগ্য এবং এগুলি অস্বাস্থ্যকর খাদ্য, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন এবং ধূমপানের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষজ্ঞরা সরকারের সেই দাবিকে উপহাস করেছেন যেখানে সরকার স্থুলতা এবং অতিরিক্ত মদ্যপানের মতো গভীর জনস্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে তাদের পদ্ধতিকে ‘মৌলিক’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
হেলথ ফাউন্ডেশন প্রকৃতপক্ষে সাহসী নীতি গ্রহণের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সুগার ট্যাক্সের নীতি অন্যান্য খাদ্যপণ্যে অপ্রয়োজনীয় চর্বি, লবণ এবং চিনি বাদ দিতে খাদ্য সংস্থাগুলোকে বাধ্য করা এবং স্কটল্যান্ডের মতো অ্যালকোহলের ন্যূনতম একক মূল্য নির্ধারণের মতো পদক্ষেপ। থিঙ্কট্যাঙ্কটি মন্ত্রীদের এনএইচএস-এর বাইরে গিয়ে অসুস্থতার মূল কারণগুলির উপর মনোযোগ দিতে একটি নতুন পদ্ধতি অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে।
গত বছর লেবার পার্টি এনএইচএস-কে ঠিক করা এবং জনগণের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানোর লক্ষ্যে একটি ১০ বছরের স্বাস্থ্য পরিকল্পনা উন্মোচন করেছিল, বিশেষ করে চিকিৎসা থেকে প্রতিরোধের দিকে ‘বড় পরিবর্তন’ আনার মাধ্যমে। তবে এখন পর্যন্ত অগ্রগতি ধীর এবং ফলাফল মাত্র কয়েকটি জায়গায় দৃশ্যমান। বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের অবনতি এই বৃহৎ পরিকল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
তথ্যসূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান