জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ম্লান হচ্ছে শতবর্ষী ‘সার্ন জায়ান্ট’, চলছে পুনর্নবীকরণ কাজ

ইংল্যান্ডের ডরসেটের পাহাড়ে খোদাই করা শতবর্ষী বিখ্যাত চকচিত্র ‘সার্ন জায়ান্ট’ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে পড়ছে। এর উজ্জ্বল সাদা রঙ ধরে রাখতে বর্তমানে ব্যাপক পুনর্নবীকরণ কাজ চালাচ্ছে সাইটটির তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ট্রাস্ট।

বিজ্ঞাপন

ডরসেটের গ্রামীণ পাহাড়ে অবস্থিত প্রায় ৫৫ মিটার দীর্ঘ এই বিশাল মানবাকৃতির চিত্রটি বহু শতাব্দী ধরে স্থানীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পরিচিত। দূর-দূরান্ত থেকেও যাতে এটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়, সেজন্য প্রতি কয়েক বছর পরপর নতুন করে চক বসিয়ে এর রূপরেখা পুনর্গঠন করা হয়।

ন্যাশনাল ট্রাস্টের লিড রেঞ্জার লুক ডসন জানান, বর্তমানে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে শৈবালের বৃদ্ধি বাড়ছে, যা ধীরে ধীরে দৈত্যটির উজ্জ্বল সাদা রঙকে নিস্তেজ করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চক ধুয়ে নিচে নামিয়ে নিচ্ছে, ফলে ক্ষয়ের ঝুঁকিও বেড়েছে।

তিনি বলেন, “উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া শৈবাল বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করছে। পাশাপাশি আগের তুলনায় ভারী বৃষ্টিপাত বেশি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দৈত্যটির ক্ষতির কারণ হতে পারে।”

বিজ্ঞাপন

সাধারণত প্রতি সাত থেকে দশ বছর পরপর সার্ন জায়ান্টে নতুন চক বসানো হয়। সর্বশেষ ২০১৯ সালে এটি পুনর্নবীকরণ করা হয়েছিল। তবে পরিবর্তিত আবহাওয়ার কারণে এখন আরও ঘন ঘন এ কাজ করতে হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এবার পুনর্নবীকরণ কাজে নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। আগে শুকনো চক বসিয়ে সেটিকে শক্তভাবে চাপ দিয়ে আটকে দেওয়া হতো। কিন্তু পাহাড়টি অত্যন্ত খাড়া হওয়ায় এবার প্রায় ১৭ টন চক পানির সঙ্গে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করা হয়েছে। এতে কাজ সহজ হচ্ছে এবং চক বেশি স্থায়ীভাবে আটকে থাকছে বলে জানিয়েছেন কর্মীরা।

এই কাজে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীরাও অংশ নিচ্ছেন। স্থানীয় গির্জার যাজক, ব্রুয়ারির কর্মী এবং আশপাশের স্কুলের শিক্ষার্থীরাও কাজ করছেন পাহাড়ে।

তবে তীব্র গরমের কারণে কাজের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। দুপুরের অতিরিক্ত তাপ এড়াতে কিছু শিফট বাতিল করা হয়েছে। শ্রমিকদের জন্য পাহাড়ের ওপর ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর বিশ্রাম দেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি দেশজুড়ে পরিচালিত একটি তহবিল সংগ্রহ অভিযানের মাধ্যমে ন্যাশনাল ট্রাস্ট দৈত্যটির আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ জমিও কিনতে সক্ষম হয়েছে। ব্রিটিশ অভিনেতা ও উপস্থাপক স্টিফেন ফ্রাইয়ের সমর্থনে পরিচালিত এই অভিযানে মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে ৩ লাখ ৩০ হাজার পাউন্ড সংগ্রহ করা হয়। যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও বিপুল পরিমাণ অনুদান আসে।

নেদারল্যান্ডস থেকে আসা স্বেচ্ছাসেবী ডেবি ভ্যান ডেন বার্গ বলেন, “এটি খুবই বিশেষ একটি ঐতিহ্য। এমন একটি চিত্রকে এত যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করতে দেখে আমি মুগ্ধ।”

ঐতিহাসিকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই রহস্য হয়ে আছে সার্ন জায়ান্টের প্রকৃত উৎপত্তি। কেউ এটিকে গ্রিক বীর হারকিউলিসের প্রতীক মনে করেন, আবার কেউ বলেন এটি অলিভার ক্রোমওয়েলের ব্যঙ্গচিত্র। তবে ২০২১ সালে পরিচালিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়, এটি সম্ভবত খ্রিস্টীয় ৭০০ থেকে ১১০০ সালের মধ্যে স্যাক্সন যুগের শেষভাগে তৈরি হয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে দৈত্যটির দেখভাল করা ন্যাশনাল ট্রাস্টের রেঞ্জার মাইকেল ক্লার্ক বলেন, “মানুষ সবসময় দৈত্যটিকে উজ্জ্বল অবস্থায় দেখতে চায়। আশা করছি এবার কাজ শেষে এটি আবার নতুনের মতো ঝলমলে হয়ে উঠবে।”

তথ্যসূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান

0%
0%
0%
0%