দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার বিধাননগরের প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর দেবরাজ চক্রবর্তী

রাজ্য রাজনীতিতে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর তথা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন বিধায়ক দেবরাজ চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সম্পত্তির হিসাব নয়ছয় এবং তোলাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বুধবার পুরুলিয়া থেকে তাঁকে পাকড়াও করা হয়। গ্রেপ্তারির আগে থেকেই নিজের এবং স্ত্রী অদিতি মুন্সীর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে রক্ষাকবচ চেয়েছিলেন দেবরাজ। তবে উচ্চ আদালত অদিতিকে শিশুসন্তানের কারণে স্বস্তি দিলেও দেবরাজের আবেদন খারিজ করে দেয়। এর পরপরই পুলিশের জালে ধরা পড়েন তিনি।
গত এগারো বছরে রকেট গতিতে রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছিল দেবরাজ চক্রবর্তীর। ২০১১ সালে রাজারহাট-গোপালপুরের তৎকালীন বিধায়ক পূর্ণেন্দু বসুর সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করলেও খুব দ্রুতই দলবদল করে নিজস্ব প্রভাব বলয় তৈরি করেন তিনি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর উত্তর ২৪ পরগনা জেলা যুব তৃণমূলের সভাপতি পদে আসীন হন দেবরাজ। অভিযোগ রয়েছে, এই রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি বিধাননগর ও সংলগ্ন এলাকায় পাহাড়প্রমাণ সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠেন। দম্পতি ও তাঁদের ঘনিষ্ঠদের নামে বেনামে প্রায় ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তির খোঁজ মিলেছে বলে দাবি তদন্তকারীদের।
দেবরাজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল নাটকীয়। কংগ্রেসের টিকিটে কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় পুনরায় তৃণমূলে ফিরে আসা এবং পরবর্তীতে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ নিয়ে দলের ভেতরেই নানা গুঞ্জন ছিল। বিশেষ করে রিয়্যালিটি শো-খ্যাত গায়িকা অদিতির সঙ্গে বিয়ের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের পর থেকেই দেবরাজের অর্থনৈতিক উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। অভিযোগ ওঠে, রাজারহাট ও বাগুইআটি এলাকার নির্মাণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তোলা আদায় এবং সিন্ডিকেট রাজ কায়েম করে তিনি বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। ২০২১ সালে স্ত্রীর বিধায়ক হওয়ার পর তাঁর প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়।
বর্তমানে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট দেবরাজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর তদন্ত করছে। তদন্তকারীদের সূত্র অনুযায়ী, গ্রেপ্তার এড়াতে দেবরাজ ‘পাকা অপরাধী’র কায়দায় উত্তরবঙ্গ, ঝাড়খণ্ডসহ বিভিন্ন রাজ্যে ডেরা পরিবর্তন করছিলেন। মোবাইল বন্ধ রেখে এবং ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের সহায়তায় আড়ালে থেকে তিনি গা ঢাকা দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর এক সহযোগীর গতিবিধি অনুসরণ করেই পুলিশ তাঁকে পুরুলিয়া ও ঝাড়খণ্ড সীমান্ত সংলগ্ন একটি নির্মীয়মাণ রিসর্ট থেকে আটক করতে সক্ষম হয়।
তদন্তের স্বার্থে এখন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি-ও মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেবরাজ ও অদিতির সম্পত্তি বাড়ার নেপথ্যে থাকা ‘ডিসি গ্লোবাল’ নামক সংস্থাকে মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচারের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণা পুলিশের। রাজারহাট-গোপালপুরের বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারির দাবি, এই দুর্নীতির পরিমাণ ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। পাশাপাশি, নির্বাচনী হলফনামায় সম্পত্তির ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগে অদিতির ভূমিকাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। বর্তমানে বাজেয়াপ্ত করা মোবাইল ও ল্যাপটপের তথ্যাদি উদ্ধারে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: হিন্দুস্থান টাইমস