মস্তিষ্কের সুরক্ষায় জীবনযাত্রায় পরিবর্তন ও সচেতনতা জরুরি

মানবদেহের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র বা ‘কমান্ড সেন্টার’ হিসেবে পরিচিত মস্তিষ্ক আমাদের চিন্তা, স্মৃতি, আবেগ ও শারীরিক নড়াচড়ার মূল চালিকাশক্তি। অথচ হৃদযন্ত্র বা লিভারের যত্নের বিষয়ে মানুষ যতটা সচেতন, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সেই তুলনায় উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৫৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত, যার মধ্যে অ্যালঝাইমার্স ডিজিজ অন্যতম প্রধান স্নায়বিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। জুন মাস বিশ্বব্যাপী ‘অ্যালঝাইমার্স ও ব্রেন হেলথ অ্যাওয়ারনেস মাস’ হিসেবে পালিত হয়, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বার্ধক্যজনিত সমস্যা শুরুর আগেই মস্তিষ্কের সুরক্ষায় সক্রিয় হওয়া অপরিহার্য।
মণিপাল হাসপাতালের ব্রডওয়ে নিউরোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট বৈভব শেঠের মতে, মস্তিষ্কের অবক্ষয় কেবল বার্ধক্যের বিষয় নয়, বরং সারাজীবনের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার ধরনের ওপর এটি গভীরভাবে নির্ভরশীল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘নিউরোপ্লাসিটি’ নামক একটি চমৎকার ধারণা রয়েছে, যার অর্থ হলো মস্তিষ্ক আজীবন নতুন নতুন কোষীয় সংযোগ তৈরির সক্ষমতা রাখে। নিয়মিত পাজল মেলানো, নতুন ভাষা শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো কিংবা বই পড়ার মতো গঠনমূলক অভ্যেস মস্তিষ্ককে সচল ও তরুণ রাখতে সাহায্য করে।
মস্তিষ্কের সুস্থতায় পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সারাদিনের স্মৃতি সংরক্ষণ ও ক্ষতিকর বর্জ্য পরিষ্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করে, তাই অনিয়মিত ঘুম মনোযোগ ও স্মৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি শারীরিক ব্যায়াম মস্তিষ্কের জন্য ওষুধের মতো কাজ করে; নিয়মিত হাঁটা, সাঁতার কাটা বা যোগব্যায়াম রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে মস্তিষ্কে অক্সিজেন ও পুষ্টির জোগান অটুট রাখে।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক। ভারতর চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্যের জন্য অতীব জরুরি, কারণ রক্তনালীর সুস্থতা সরাসরি মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব ফেলে। সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো একাকীত্ব বা বিষণ্ণতা দূর করে মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় ক্ষমতাকে সজীব রাখে।
অতিরিক্ত ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ রক্তনালীর ক্ষতি করে স্নায়বিক স্বাস্থ্যকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে, তাই এসব অভ্যাস বর্জন করা জরুরি। এছাড়া শ্রবণশক্তির সমস্যা অনেক সময় মস্তিষ্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়, ফলে নিয়মিত শ্রবণ পরীক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। স্ট্রোক ও দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক রোগ এড়াতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতন জীবনযাপনই পারে মস্তিষ্কের সুস্থতা দীর্ঘস্থায়ী করতে।
তথ্যসূত্র: হিন্দুস্থান টাইমস