শক্তিশালী লবি ও দলীয় বলয় ভেঙে মিশিগানে আব্দুল সায়েদের অভাবনীয় জয়

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়েছেন প্রগতিশীল প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদ। ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব, প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার এবং শক্তিশালী ইহুদি লবি ‘আইপ্যাক’ (এআইপিএসি)-এর বিপুল অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবকে তুচ্ছ করে তিনি এই জয় ছিনিয়ে এনেছেন। বুধবার ভোরে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসওম্যান হ্যালি স্টিভেনসকে পরাজিত করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় আব্দুল আল-সায়েদের বিরুদ্ধে অন্তত ৭ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ খরচ করেছিল বিভিন্ন বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, যার বড় অংশই ছিল আইপ্যাক-এর। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত সায়েদ নির্বাচনী মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে লড়াই করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তবে তার এই বিজয় প্রমাণ করে যে, বড় অংকের নির্বাচনী তহবিল বা হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক সমর্থন এখন আর ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে জেতার একমাত্র নিয়ামক নয়।
এই ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রগতিশীল সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এই জয়কে আধুনিক মার্কিন রাজনীতির ‘সবচেয়ে অসাধারণ বিজয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। স্যান্ডার্স তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, প্রার্থীর ৯ গুণ বেশি অর্থ খরচ করা প্রতিপক্ষ এবং দলীয় স্থাপনাকে পেছনে ফেলে এমন জয় আগে কখনো দেখা যায়নি। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই জয় এমন এক বার্তা দিচ্ছে যে, সাধারণ মানুষ এখন যুদ্ধবিরোধী এজেন্ডা এবং শ্রমিক শ্রেণির কল্যাণে কাজ করা প্রার্থীদের বেছে নিতে বেশি আগ্রহী।
আল-সায়েদের এই জয়ের পাশাপাশি মিশিগানের অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচনেও প্রগতিশীলদের উত্থান স্পষ্ট হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সায়েদের এই বিজয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘সুইং স্টেট’-এ অর্জিত হয়েছে, যেখানে গত দুই বছরের কম সময়ের ব্যবধানে ট্রাম্পের মতো নেতারা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণায় সায়েদ ‘রাজনীতি থেকে অর্থায়ন বন্ধ’ এবং ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
তবে এই পরাজয় সহজে মেনে নিচ্ছে না আইপ্যাক। তারা স্পষ্ট করেছে যে, নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে আব্দুল আল-সায়েদকে রুখতে তারা তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। সায়েদকে নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের মোকাবিলা করতে হবে, যিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ফিলিস্তিন ইস্যু এই নির্বাচনে একটি প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা দিয়েছে, যেখানে অনেক ভোটার গাজায় যুদ্ধের জন্য মার্কিন অর্থায়নের তীব্র বিরোধিতা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, আল-সায়েদের এই জয় ওয়াশিংটনের ক্ষমতাধরদের প্রতি ভোটারদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। মিশিগান-ডিয়ারবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যালি হাওয়েল মনে করেন, ভোটাররা এখন আর গতানুগতিক রাজনীতির পরিবর্তন চায় না, তারা চায় আমূল সংস্কার। ডেমোক্রেটিক দলের ভেতরে চলা এই ক্ষমতার লড়াই এবং তৃণমূলের এই জয় দেশটির আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
