স্পেনের সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ আরোপের নেপথ্যে ইতালির রাজনৈতিক কৌশল

স্পেনের সেউতা ছিটমহলে সম্প্রতি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অনুপ্রবেশ ও প্রাণহানির ঘটনার জেরে দেশটির সঙ্গে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছে ইতালি। বিশ্লেষকদের মতে, রোমের এই পদক্ষেপটি মূলত কৌশলগত বা বাস্তবসম্মত নয়, বরং এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি রাজনৈতিক নাটক। মরক্কো থেকে স্পেনের সেউতায় ৬০ হাজারের বেশি মানুষ প্রবেশের কয়েক দিন পর ইতালি এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সেউতার প্রেসিডেন্ট হুয়ান জেসুস ভিভাস জানান, এই বিপজ্জনক যাত্রাপথে অন্তত ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে তিন থেকে পাঁচ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী ছিটমহলটিতে অবস্থান করছেন। তবে অধিকাংশ অভিবাসীই নিজ গন্তব্যে ফিরে গেছেন। সেন্টার ফর ইউরোপীয় পলিসি স্টাডিজের জাস্টিস অ্যান্ড হোম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের গবেষক দাভিদে কোলোম্বি আল-জাজিরাকে বলেন, ইতালি সরকার শেনজেন চুক্তি বাতিলের যে আওয়াজ তুলেছে, তা আইনত সম্ভব নয়। কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে শেনজেন অঞ্চল থেকে বহিষ্কার করার সুযোগ নেই, ইতালি কেবল অস্থায়ীভাবে অভ্যন্তরীণ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনরায় কার্যকর করতে পারে।
শেনজেন অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোতে পাসপোর্টহীন চলাচল দীর্ঘদিনের চর্চা হলেও অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে ও সুইডেনের মতো দেশগুলো ২০১৫ সাল থেকেই কোনো না কোনোভাবে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেউতা থেকে কোনো অভিবাসনপ্রত্যাশীর পক্ষে ইতালিতে পৌঁছানোর বাস্তব কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে ইতালির এই পদক্ষেপ মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের ভোটারদের সামনে ‘কঠিন অভিবাসন নীতি’ বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রদর্শন করতে চাইছে।
ইতালির এই অবস্থানকে ‘রাজনৈতিক থিয়েটার’ বলে অভিহিত করেছেন ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন অন আনডকুমেন্টেড মাইগ্র্যান্টস-এর অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা চিয়ারা কাতেল্লি। তিনি মনে করেন, এটি কেবল পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। এদিকে, পোল্যান্ড যখন বেলারুশ সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার স্থগিত করেছিল, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, স্পেনের ক্ষেত্রে তার ভিন্নতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্পেনের সমাজতান্ত্রিক সরকারের তুলনামূলক উদার অভিবাসন নীতি এবং অর্থনৈতিক একীভূতকরণের পদক্ষেপই সম্ভবত এমন কঠোর প্রতিক্রিয়ার কারণ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন ও আশ্রয় বিষয়ক চুক্তি কার্যকর হওয়ার মাত্র ছয় সপ্তাহের মাথায় ইতালির এই পদক্ষেপ পুরো ব্লকের সংহতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ২০২৭ সালে ইতালি, স্পেন ও ফ্রান্সের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে অভিবাসন ইস্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, শেনজেন চুক্তি কোনো বাহ্যিক হুমকির মুখে নেই, বরং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থপরতা এবং ইউরোপীয় কমিশনের অকার্যকারিতাই মুক্ত চলাচল ব্যবস্থাকে ধীরগতিতে ভেঙে দিচ্ছে। অভিবাসন কোনো অস্তিত্বের সংকট নয়, বরং এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের অভাবই ইউরোপের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
