অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংস বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলোর দৌরাত্ম্য ও পরিকল্পিত উচ্ছেদ অভিযান

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এক নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মতাদর্শে দীক্ষিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং তাদের ভূখণ্ড দখলের লক্ষ্যে একের পর এক পরিকল্পিত আক্রমণ চালাচ্ছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন হামলা নয়, বরং সুসংগঠিত পন্থায় স্থানীয়দের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করে তুলছে এবং বসতি বিস্তারের মাধ্যমে সেখানে নতুন বাস্তবতা তৈরির চেষ্টা করছে।
এই সহিংসতার মূলে রয়েছে ‘হিলটপ ইয়ুথ’-এর মতো শক্তিশালী গোষ্ঠী, যারা মূলত ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণদের নিয়ে গঠিত। ১৯৯৮ সালে সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারনের পাহাড়ের চূড়াগুলো দখলের উসকানিমূলক আহ্বানের পর থেকেই এই গোষ্ঠীটির বিস্তার ঘটে। বর্তমানে তারা পশ্চিম তীরের পাহাড়গুলোতে অস্থায়ী আস্তানা তৈরি করে ফিলিস্তিনি কৃষকদের জমি দখল, জলপাই গাছ উপড়ে ফেলা এবং বসতি স্থাপনের নামে নতুন নতুন ফাঁড়ি গড়ে তুলছে। পিস নাউ-এর তথ্যমতে, ২০২০ সালের শেষ নাগাদ এই গোষ্ঠী ১৭০টি অবৈধ বসতি স্থাপন করেছে।
এদিকে, ২০০৮ সালে উদ্ভূত ‘প্রাইস ট্যাগ’ নামক গোপন নেটওয়ার্কটি সহিংসতাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইৎজহার বসতির ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালিত এই গোষ্ঠীটির মতাদর্শ হলো—বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার বিপরীতে ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো। এদের হামলার তালিকায় রয়েছে ঘরবাড়ি ও গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, মসজিদ ও গির্জায় ভাঙচুর চালানো এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর সরাসরি শারীরিক নির্যাতন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। ইসরায়েলি সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নির্দেশে বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ব্যাপক হারে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছে এবং ‘গার্ড টিম’ নামক সামরিক আদলের বাহিনী গঠন করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা বি’সেলেম এবং ইয়েশ দিনের তথ্য অনুযায়ী, সামরিক পোশাক ও অস্ত্রধারী এসব বসতি স্থাপনকারী এখন অহরহ ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলিবর্ষণ ও সম্পদ ধ্বংসের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এতে বেসামরিক ও সামরিক পরিচয়ের বিভাজন অস্পষ্ট হয়ে পড়ায় অপরাধীদের শনাক্ত করা ও তাদের বিচারের আওতায় আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি বিস্তারের এ দৌরাত্ম্য থামার কোনো লক্ষণ নেই। প্যালেস্টাইন কোলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশনের তথ্য মতে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ৪২টি নতুন অবৈধ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৩ হাজার ৪৮৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে ১৮টি বেদুঈন বসতি সম্পূর্ণ উচ্ছেদ হয়েছে। ইসরায়েলি সংস্থা ইয়েশ দিনের প্রতিবেদন বলছে, বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগের ৯১ শতাংশই কোনো ধরনের বিচারিক রায় ছাড়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মাত্র ১.৮ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে, যা এই গোষ্ঠীর দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে স্পষ্ট করে তোলে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
