ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপ দক্ষিণ লেবানন নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে

ইসরায়েলি বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণে দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই জনপদে মানুষ যখন জীবনের ভগ্নস্তূপ সরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করছে, ঠিক তখনই নতুন করে সহিংসতার আতঙ্ক তাদের তাড়া করে ফিরছে। লেবাননের জাউতার আল-গারবিয়াহ গ্রামের চিত্রটি যেন দেশটির সামগ্রিক সংকটেরই এক প্রতিচ্ছবি। গত বছরের সেপ্টেম্বর এবং চলতি বছরের মার্চ মাসে দুই দফায় তীব্রতর হওয়া এই সংঘাতে জনপদগুলো আজ বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই যুদ্ধ কেবল বসতবাড়িই ধ্বংস করেনি, ভেঙে দিয়েছে মানুষের মেরুদণ্ডও। ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ তার ধ্বংসপ্রাপ্ত বসতভিটার সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে জানান, বেঁচে থাকার তাগিদে এখন তাকে নিজের ঘরের ভাঙা লোহা-লক্কড় কুড়িয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। ২০১৯ সাল থেকে অর্থনৈতিক ধস এবং ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়ের কবলে থাকা লেবাননের সাধারণ মানুষ আজ সঞ্চয়হীন ও নিঃস্ব। দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব কার্যকর কোনো সংস্কার করতে ব্যর্থ হওয়ায় আন্তর্জাতিক তহবিল প্রাপ্তির পথও রুদ্ধ।
সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণে লেবাননের কর্মকর্তারা যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই পুনর্গঠন বাবদ খরচ ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। অথচ এই বিশাল অঙ্কের অর্থ সংস্থানের কোনো সুনির্দিষ্ট উৎস নেই। বিশ্বব্যাংকের পূর্বের হিসাব অনুযায়ী, আগের সংঘাতগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ছিল ১১ বিলিয়ন ডলার, যা পরিশোধের সক্ষমতা দেউলিয়া প্রায় লেবানন সরকারের নেই। আন্তর্জাতিক দাতারাও পুনর্গঠনের সহায়তাকে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের শর্তের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে রাজনীতি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসন কেবল ঘরবাড়ি ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং যেকোনো ধরনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করতে তারা পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ সরঞ্জাম, ভারী যন্ত্রপাতি এবং কারখানাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের অনেক এলাকা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দখলে রয়েছে, যেখানে জলসেচ ব্যবস্থা ও কৃষি খামারগুলোও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। আল-মানসুরি গ্রামের পৌরপ্রধান হায়দার মুদাইহি জানান, সেখানকার পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, গ্রামবাসীরা এখনো ইসরায়েলি বাহিনীর গুলির ভয়ে চলাচল করতে পারছে না।
বেইরুট বন্দরের ভয়াবহ বিস্ফোরণের ষষ্ঠ বার্ষিকীতে লেবাননের মানুষ যখন ন্যায়বিচারের দাবি তুলছে, তখনই দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের এই নতুন ট্র্যাজেডি তাদের চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে তথাকথিত ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন নেই। চুক্তিতে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট সময়রেখা না থাকায় সীমান্ত এলাকায় শান্তি আজও সুদূরপরাহত। ফলে, আবারও ঘরবাড়ি হারানো হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
