তাইওয়ানের চারপাশে চীনের নৌ-মহড়া বৃদ্ধি, অবরোধের আশঙ্কায় বিশ্লেষকরা

তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় জলসীমায় চীনের কোস্টগার্ড এবং বেসামরিক নৌবহরের উপস্থিতি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের এই কর্মকাণ্ড মূলত স্বশাসিত দ্বীপটিকে বাইরের বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অংশ। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন ও জুলাই মাসজুড়ে চীনের মেরিটাইম সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং কোস্টগার্ড এই এলাকায় একের পর এক ‘বিশেষ মেরিটাইম আইন প্রয়োগকারী অভিযান’ পরিচালনা করেছে, যা অঞ্চলটিতে নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সাধারণত তাইওয়ান প্রণালীকে কেন্দ্র করেই চীনের নৌ-তৎপরতা সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এবার বেইজিংয়ের নজর তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় জলসীমার দিকে সরে এসেছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব এশিয়ান রিসার্চের ফেলো কে ট্রিস্টান ট্যাংয়ের ভাষ্যমতে, বেইজিং এর মাধ্যমে তাদের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলে প্রসারিত করতে চাইছে। কৌশলগতভাবে তারা দ্বীপটিকে কেবল প্রণালীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলার বার্তা দিচ্ছে।

তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে চীনের কোস্টগার্ড ও গবেষণা জাহাজের উপস্থিতি ৫৫ বার রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে মে মাসে এই সংখ্যা ছিল ৩০টি। দক্ষিণ চীন সাগরের দংশা দ্বীপপুঞ্জের কাছেও চীনা নৌযানগুলোর গতিবিধি লক্ষ্য করা গেছে। বেইজিং দাবি করছে, জাপান ও ফিলিপাইনের মধ্যকার সমুদ্রসীমা নির্ধারণ সংক্রান্ত আলোচনার প্রতিক্রিয়ায় তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে, যা তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অংশ।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সি-লাইট প্রজেক্টের পরিচালক রে পাওয়েল বেইজিংয়ের এই রণকৌশলকে ‘বোয়া কন্সট্রিক্টর’ বা অজগর সাপের মতো চেপে ধরার কৌশলের সাথে তুলনা করেছেন। তার শঙ্কা, আইন প্রয়োগের নামে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম যেকোনো মুহূর্তে অবরোধ বা কঠোর কোয়ারেন্টাইনে রূপ নিতে পারে। তাইওয়ান তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির প্রায় পুরোটাই আমদানি করে, ফলে সমুদ্রপথের যেকোনো বিঘ্ন দ্বীপরাষ্ট্রটির জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

চীন যে তাইওয়ানকে পুরোপুরি কোণঠাসা করার পরিকল্পনা করছে, তার আলামত আগে থেকেই স্পষ্ট। ২০২২ সাল থেকে বেইজিং তাইওয়ান প্রণালীতে বড় আকারের সামরিক মহড়া চালিয়ে আসছে, যার মধ্যে অবরোধের মহড়াও অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদিও চীনের কোস্টগার্ডকে বেসামরিক বাহিনী হিসেবে দাবি করা হয়, কিন্তু তারা মূলত সরাসরি চীনের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের অধীনস্থ একটি আধা-সামরিক বাহিনী। তাইওয়ান একে চীনের ‘দ্বিতীয় নৌবাহিনী’ হিসেবেই বিবেচনা করে।

চীনের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিরল প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী দেশগুলো। পশ্চিমা শক্তিগুলোর দাবি, বেইজিংয়ের এই একতরফা পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং মুক্ত নৌ-চলাচলকে হুমকির মুখে ফেলছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে জর্জরিত থাকায় বেইজিং এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাইওয়ান ঘিরে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%