আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চলমান বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির দাবি, বিচারিক কার্যক্রমে বিদ্যমান বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটির কারণে ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বুধবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি এমন আশঙ্কার কথা জানায়।
উল্লেখ্য, মতিঝিলের শাপলা চত্বরের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রেক্ষিতেই মূলত হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, অতীতে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার বিচার ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা অপরিহার্য হলেও সেই বিচারপ্রক্রিয়া হতে হবে আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড অনুসরণ করে। অন্যথায় আইনের শাসন দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী মন্তব্য করেছেন যে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার হওয়া উচিত। তবে বর্তমান বিচারপ্রক্রিয়ার অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণ হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পথ রুদ্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
সংস্থাটির ভাষ্যমতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে কিছু সংশোধনী আনা হলেও এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়ে গেছে। পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তারের নির্দেশ, দীর্ঘ সময় কারণ না দর্শিয়ে আটক রাখা, অন্তর্বর্তীকালীন আপিলের সীমাবদ্ধতা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ না দেওয়ার মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থী। এছাড়া, তদন্ত কর্মকর্তাদের নেওয়া একাধিক সাক্ষ্যের জবানবন্দিতে হুবহু একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা সংগৃহীত সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তুলেছে।
সংস্থাটি আরও অভিযোগ করেছে যে, একটি মামলার ক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিচারিক কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হয়েছে। শাপলা চত্বরের ঘটনায় দুই সাংবাদিককে আসামি করার বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের দাবি, ওই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের কারণ লিখিতভাবে জানানো হয়নি, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চর্চার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
পরিশেষে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সতর্ক করে বলেছে, অতীতের অন্যায়ের বিচার করতে গিয়ে যেন নতুন কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিচারকার্য সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। এই বিচারপ্রক্রিয়া যেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের অধীনে একটি শক্তিশালী ও ন্যায়পরায়ণ আইনি কাঠামোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, সেদিকেই সজাগ দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।