লোহিত সাগরে হুথি অবরোধের মুখে সৌদি তেলের বিকল্প রপ্তানি পথ ঝুঁকিতে

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ ঘোষণার পর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় গভীর সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। লোহিত সাগরে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলবাহী দুটি ট্যাঙ্কার তাদের গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হওয়ায় এই উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাবেল মান্দেব প্রণালী দিয়ে এশিয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৬০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়, যা এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
শিপিং অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ২৮ লক্ষ ব্যারেল তেল নিয়ে ‘রোডোস’ ও ‘সিন লং ইয়াং’ নামের দুটি ট্যাঙ্কার যাত্রা শুরু করেছিল। ইয়েমেন ও হর্ন অব আফ্রিকার মধ্যবর্তী বাবেল মান্দেব প্রণালীর দিকে এগিয়ে গেলেও, হুতিদের হুমকির মুখে জাহাজ দুটি উত্তরের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এটিই প্রথম দৃশ্যমান প্রমাণ যে, হুতিদের অবরোধের হুমকি সৌদি জ্বালানি রপ্তানির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এর আগে হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা এড়াতে সৌদি আরব ইয়ানবু পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি করছিল। তবে এখন বাবেল মান্দেব প্রণালীও হুতিদের হুমকির মুখে পড়ায় সেই বিকল্প পথটিও অকার্যকর হওয়ার পথে। এশিয়াপন্থী শোধনাগারগুলো এখন সুয়েজ খাল হয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার কথা ভাবছে, যা ভূমধ্যসাগর ঘুরে আফ্রিকা মহাদেশের উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে এশিয়ায় পৌঁছাবে। এই বিকল্প রুটটি চালু রাখলে গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ অতিরিক্ত সময়ের পাশাপাশি জাহাজ ভাড়া ও জ্বালানি খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
হরমুজ প্রণালীতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার কারণে আগেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। কেপলারের তথ্যমতে, মঙ্গলবারের হিসাব অনুযায়ী হরমুজ দিয়ে মাত্র তিনটি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে, অথচ যুদ্ধের আগে এই রুট দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ হতো। এখন ইয়েমেনের আকাশসীমা ও বন্দরগুলোতে হামলার প্রতিক্রিয়ায় হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কঠোর অবরোধের ডাক দেওয়ায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলো জ্বালানি আমদানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় এই সংকট তাদের অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করবে। বিশেষ করে ভারত তাদের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকের বেশি বাবেল মান্দেব দিয়ে নিয়ে আসে। এছাড়া পাকিস্তান, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান এবং চীনের মতো দেশগুলোও ভয়াবহ জ্বালানি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইয়ানবু থেকে আসা বৃহৎ ট্যাঙ্কারগুলো সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচলের উপযোগী নয়। ফলে জাহাজগুলোকে কার্গো খালাস করে বা ছোট ট্যাঙ্কারে তেল স্থানান্তর করে গন্তব্যে পাঠাতে হবে, যা সরবরাহ চেইনের লজিস্টিক সক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলবে। সুয়েজ খাল হয়তো সাময়িক চাপ কমাতে পারে, কিন্তু হরমুজ ও বাবেল মান্দেবের মতো সরাসরি ও সাশ্রয়ী রুটের বিকল্প হওয়া কঠিন। যদি এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথই দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়ে, তবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা