ব্যর্থ মধ্যস্থতা ও নতুন করে সংঘাত: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকট নিরসনে দিশেহারা পাকিস্তান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পারদ আবারও তুঙ্গে উঠেছে। গত ১৭ জুন পাকিস্তানসহ অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি বর্তমানে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাতের প্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে উভয় পক্ষকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার সকালে ইরান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পরিচালনা করে। তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সমঝোতা স্মারকের শর্তসমূহ বারবার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পাকিস্তানসহ কাতার ও ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও যুদ্ধের তীব্রতা বিন্দুমাত্র কমছে না।
পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে সংকট নিরসনে কূটনীতিকেই একমাত্র পথ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলাপে শান্তি প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তবে মাঠপর্যায়ে সামরিক কর্মকাণ্ডের ধরন দেখে অনেক বিশ্লেষকই প্রশ্ন তুলেছেন—দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের গভীর আস্থার সংকট নিরসনে পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর পক্ষে আর কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব কি না।
গত এপ্রিলের পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত তিনবার যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় ইরানের অন্তত ১০টি প্রদেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে একজন সৈন্য, দক্ষিণ হরমোজগান প্রদেশের কয়েকজন জেলে এবং সিস্তান ও বালুচেস্তান প্রদেশের একজন দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়া চীন ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলসেতুও মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কাতার ও ওমানের মতো দেশগুলোও এই সংকটে সরাসরি জড়িয়ে পড়ছে। গত রবিবার কাতারের ভূখণ্ডে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হানলে শিশুসহ অন্তত তিনজন আহত হয়। ইরান দাবি করেছে, তারা সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী সদিচ্ছা দেখালেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করা হচ্ছে। পাল্টাপাল্টি এই হামলায় হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধ আবারও নতুন রূপ নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের হাতে এই সংঘাত থামানোর মতো কার্যকর কোনো সরঞ্জাম নেই। তেহরানভিত্তিক বিশেষজ্ঞ জাভেদ হেইরান-নিয়ার মতে, সমঝোতা স্মারকটি মূলত সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ইরান এখন হরমুজ প্রণালীকে তাদের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে এবং যেকোনো মূল্যে তা ধরে রাখতে যুদ্ধের ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত।
অন্যদিকে, ইসলামাবাদভিত্তিক সানোবার ইনস্টিটিউটের প্রধান কামার চিমা মনে করেন, পাকিস্তানের সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ এখনো প্রভাবশালী। তার মতে, উভয় দেশই যেকোনো সংকটকালে ইসলামাবাদের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখে, যা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের গুরুত্ব প্রমাণ করে। তবে ইসরায়েলের লেবানন অভিযানের মতো আঞ্চলিক অস্থিরতা এই শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।
বর্তমানে ওয়াশিংটন এবং তেহরান উভয়েই সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টা করছে। যতক্ষণ না কোনো পক্ষ চূড়ান্ত সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারছে, ততক্ষণ আলোচনার টেবিলে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবুও বিশেষজ্ঞ মহলের একটি বড় অংশ মনে করছে, সমঝোতা স্মারকটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়নি, যা ভবিষ্যতে পুনরায় আলোচনার সুযোগ জিইয়ে রেখেছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা