আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলায় ৩৬ বেসামরিক নাগরিক নিহত

আফগানিস্তানের পাকতিয়া, পাকতিকা এবং কুনার প্রদেশে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় অন্তত ৩৬ জন সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই হামলায় নারী ও শিশুসহ আরও ১৬৩ জন আহত হয়েছেন বলে আফগান কর্তৃপক্ষের বরাতে জানা গেছে। তবে পাকিস্তান দাবি করেছে, তাদের এই অভিযানে অন্তত ২৯ জন সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হয়েছেন এবং তারা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হেনেছে।
পাকতিয়া প্রদেশের চামকানি জেলার মান্দিখিল গ্রামের বাসিন্দা বিসমিল্লাহ খান দীর্ঘ ১২ বছর প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনির জমানো সব সঞ্চয় দিয়ে একটি দোতলা বাড়ি তৈরি করেছিলেন। সোমবার ভোরের আলো ফোটার আগেই বিকট বিস্ফোরণে তার সেই স্বপ্নের নীড় ধূলিসাৎ হয়ে যায়। হামলার পর বিধ্বস্ত বাড়ির ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি জানান, সেই মুহূর্তে বাড়িতে নারী ও শিশুরাই ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই হামলায় তার স্ত্রী ও কন্যা নিহত হয়েছেন এবং পরিবারের আরও দশজন সদস্য আহত হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, প্রথম দফার হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই যখন উদ্ধারকাজ চলছিল, তখন দ্বিতীয় দফায় আকাশপথে আঘাত হানা হয়। মারজিয়া খান ওয়ালি নামে এক স্থানীয় নারী জানান, যখন তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া স্বজনদের খুঁজছিলেন এবং আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আবারও বোমাবর্ষণ শুরু হয়। এতে যারা অন্যদের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন, তারা নিজেরাও প্রাণঘাতী হামলার শিকার হন।
পাকতিকা প্রদেশের জিলান গ্রামের বাসিন্দা জারমিনা জানান, কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই গভীর রাতে এই হামলা চালানো হয়। পাঁচ সন্তানের জননী জারমিনা এই হামলায় তার স্বামী ও এক কন্যাকে হারিয়েছেন। সীমান্তের নিকটবর্তী কুনার প্রদেশেও একই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাণভয়ে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে বা সীমান্ত থেকে নিরাপদ দূরত্বে আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয় প্রবীণরা জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী বাসিন্দারা এখন একদিকে যুদ্ধ আর অন্যদিকে বসতভিটা হারানোর দ্বিমুখী আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন।
উল্লেখ্য যে, ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। পাকিস্তান দাবি করে আসছে যে, তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপি-এর যোদ্ধারা আফগান ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাস নির্মূলে তাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তবে আফগান সরকার এই হামলাকে দেশটির সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর নৃশংসতা হিসেবে অভিহিত করেছে। কাবুলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দোহা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আফগান মাটি যাতে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সীমান্তের ওপারে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর সামরিক কৌশল যাই থাকুক না কেন, বিসমিল্লাহ খানের মতো সাধারণ মানুষ এখন কেবল ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে আপনজন হারানোর শোকে পাথর হয়ে গেছেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা