ইরাকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে ৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার জব্দ, নড়বড়ে কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর লড়াই

ইরাকের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি। এই ধারাবাহিকতায় তেল মন্ত্রণালয়ের পরিশোধন বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি আদনান আল-জুমাইলির বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে ৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার নগদ অর্থসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দ করেছে ইরাকের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। জব্দকৃত সম্পদের তালিকায় ৭০টি স্থাবর সম্পত্তি, ২১টি যানবাহন এবং প্রায় ৩ কেজি স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে।
আল-জুমাইলিকে ৩০ মে বাগদাদের উত্তরে আল-ইশাকি নামক শহর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি নর্থ রিফাইনারিস কোম্পানির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই তদন্তের অংশ হিসেবে সালাহ আল-দিন প্রদেশের সাবেক গভর্নর রায়েদ আল-জুবুরিকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যিনি গ্রেপ্তারের সময় প্রদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আলী আল-জাইদি সরকারি নথিপত্র ও চুক্তিসমূহ পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের ৭৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের একটি চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। সরকারি অর্থের অপচয় রোধ ও তা উদ্ধারে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি তত্ত্বাবধানে ‘সুপ্রিম সভরেন কাউন্সিল ফর ইন্টিগ্রিটি’ নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করেছেন। সরকারের মুখপাত্র হায়দার আল-আবুদি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতিকে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
তবে দুর্নীতিবিরোধী এই উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে ১৮২টি দেশের মধ্যে ইরাকের অবস্থান ১৩৬তম। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, পদ্ধতিগত দুর্নীতি ইরাকের রাজনৈতিক কাঠামোর গভীরে প্রোথিত। ফেডারেল ইন্টিগ্রিটি কমিশনের সাবেক প্রধান মুসা ফারাজ আল জাজিরাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও আগের বড় ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দুর্নীতিগুলোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
২০০৩ সাল থেকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ দেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যা দেশটির দীর্ঘ ১৮ বছরের আয়ের ৩২ শতাংশ। তবে পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার এবং অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনা অত্যন্ত জটিল বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আল-নাহরাইন ফাউন্ডেশন ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড ইন্টিগ্রিটির প্রধান মোহাম্মদ রহিম আল-রুবি জানান, দেশটির বর্তমান আইন কাঠামো ১৯৬৯ সালের দণ্ডবিধি অনুসরণ করে, যা আধুনিক যুগের বড় আকারের আর্থিক অপরাধ মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
ইরাকের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দুর্নীতি রাজনৈতিকভাবে সংরক্ষিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ইউপিএনডিপির একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটির আইনি কাঠামো অপরাধের ভয়াবহতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দুর্নীতিবিরোধী সক্রিয় কর্মী এবং শিক্ষাবিদরা বলছেন, কেবল প্রশাসনিক গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়; বরং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে না পারলে ইরাকের এই সংকট নিরসন অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা