যুক্তরাষ্ট্রের ডিটেনশন সেন্টারে অভিবাসী মৃত্যুর হার বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক বিভাগের (আইসিই) হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯ জন বন্দি মারা গেছেন, যাদের মধ্যে ৫২ বছর বয়সী হোসে গুয়াদালুপ রামোস অন্যতম। ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাডেলান্তো ডিটেনশন সেন্টারে এক মাস বন্দি থাকার পর তার মৃত্যু ঘিরে পরিবার ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং গণ-বহিষ্কার অভিযানের ফলে আটক কেন্দ্রের পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পরিসংখ্যান বলছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালে আইসিই হেফাজতে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত বছর যেখানে ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২-এ, যা প্রায় ২৯০ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বছরের শেষে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়বে। সিরাকিউস ইউনিভার্সিটির তথ্যানুযায়ী, ট্রাম্পের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় ৪ লাখ ৫ হাজার ৭০০ জনকে আইসিই ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে, যেখানে সরকার প্রতিদিনের আটকের কোটা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

হোসে রামোসের স্ত্রী আন্তোনিয়া তোভার জানান, মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও জুমের মাধ্যমে তার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল রামোসের। দীর্ঘ চার দশকের দাম্পত্য জীবনে একে অপরকে আগলে রাখার স্বপ্ন থাকলেও সরকারি অবহেলা সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে বলে তোভার অভিযোগ করেন। রামোস ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন এবং নিয়ম অনুযায়ী তাকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হতো। পরিবারের অভিযোগ, অ্যাডেলান্তো সেন্টারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অপর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবাই তার মৃত্যুর মূল কারণ।

বন্দি শিবিরের শোচনীয় দশা সম্পর্কে বলতে গিয়ে রামোস তার স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন, সেখানে খাবারের মান অত্যন্ত নিম্ন এবং পরিচ্ছন্নতার কোনো বালাই নেই। আইনজীবী জেসুস আরিয়াস জানিয়েছেন, রামোসের মৃত্যুর সময় জরুরি সেবায় চরম অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও আইসিই কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, বন্দিদের পর্যাপ্ত খাবার ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে এবং মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে খুবই কম। তবে বিশ্লেষকরা এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

রামোসের মৃত্যুতে মেক্সিকো সরকার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাম যুক্তরাষ্ট্রের ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে কনস্যুলার পরিদর্শন দৈনিক ভিত্তিতে করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং মেক্সিকোর বাজেট সংকটের কারণে এই তদারকি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর আন্তোনিয়া তোভার এখন আর স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছেন না। যুক্তরাষ্ট্রে অনিবন্ধিত অভিবাসী হিসেবে বসবাস করায় সবসময় আতঙ্কে কাটছে তার দিন। তবে রামোসের মৃত্যুর বিচার পাওয়ার জেদ তাকে এখনো শক্ত করে ধরে রেখেছে। তিনি বলেন, সুবিচারের আশায় এই লড়াই চালিয়ে যাবেন, কারণ প্রিয়জনের প্রাণহানির দায় কাউকে না কাউকে নিতেই হবে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%