পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ভারতীয় কৌশল বুমেরাং হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত

বিশ্ব ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে পাকিস্তান এখন এক নতুন কূটনৈতিক উচ্চতায় অবস্থান করছে। এক সময় ভারতকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একঘরে করার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, এক দশক পর দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে পাকিস্তানের কৌশলগত সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের পররাষ্ট্রনীতির কিছু ভুল পদক্ষেপ এবং পাকিস্তানের সময়োপযোগী কূটনৈতিক তৎপরতা দক্ষিণ এশিয়ার এই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে।
গত ১০ মে ২০২৫ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এর আগে চার দিন ধরে চলা প্রবল সংঘর্ষে দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান এবং ড্রোনের এই লড়াই গত কয়েক দশকের মধ্যে ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এই যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের ভূমিকা জোরালোভাবে তুলে ধরলেও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের অবদানকে সেভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, যা ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তানকে বিশ্বমঞ্চে বিচ্ছিন্ন করার ভারতীয় কৌশল বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে, কাশ্মীরের পাহলগাম হামলার ঘটনায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের আনা অভিযোগের সপক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনো অকাট্য প্রমাণ পায়নি। উল্টো, সংঘর্ষ চলাকালীন পাকিস্তানের হাতে বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, যা পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
পাকিস্তান এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ একাধিকবার হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। ট্রাম্প নিজে সেনাপ্রধান মুনিরকে তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা ভারতের জন্য উদ্বেগজনক। একই সাথে, খনিজ সম্পদ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগের মতো নতুন অর্থনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান ওয়াশিংটনের সাথে তাদের আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে।
এক সময় দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারে ভারত ‘সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কোঅপারেশন’ বা সার্ককে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু পাকিস্তানকে একঘরে করতে গিয়ে নয়াদিল্লি সার্কের কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, যার ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রভাব ক্রমশ ম্লান হতে থাকে। বিপরীতে, চীন পাকিস্তানের ‘অবিচ্ছেদ্য’ বন্ধু হিসেবে সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোদি সরকারের আগ্রাসী নীতি এবং ইসরায়েলের সাথে ক্রমবর্ধমান সামরিক সখ্যতা ভারত ও আরব দেশগুলোর সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভারতের প্রথাগত অবস্থানের পরিবর্তন এবং গাজায় চলমান পরিস্থিতিতে নীরবতা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো পাকিস্তানের সাথে নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে নিজেদের নিরাপত্তা বলয় আরও শক্তিশালী করছে।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এই পরিবর্তন কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথেই নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও দূরত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাণিজ্য ঘাটতি এবং বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ ভারত ও আমেরিকার সম্পর্কে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে অনেকের মতে, কৌশলগত অংশীদারত্ব এখনো টিকে থাকলেও ভারতের জন্য প্রয়োজন হলো একটি নমনীয় ও বাস্তবসম্মত কূটনীতির দিকে ফিরে আসা। কাশ্মীর সংকটসহ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধানে উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের ব্যাক-চ্যানেল আলোচনার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা