সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর মস্কোর সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে চলা অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে। দামেস্কের নতুন সরকারের সঙ্গে রাশিয়ার স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, সিরিয়ার হমেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুস নৌঘাঁটির বর্তমান রূপরেখা পুনর্গঠন করা হচ্ছে। আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে সিরিয়া তাদের ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ খুঁজে পেয়েছে।
নতুন এই চুক্তির অধীনে হমেইমিম বিমানঘাঁটি এবং তারতুস বন্দরের বাণিজ্যিক অংশটির নিয়ন্ত্রণ এখন সিরিয়ার হাতে থাকছে। সামরিক স্থাপনাগুলোকে যৌথ প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা অর্জন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যেই এই রূপান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। ২০১৪ সালে আরব বসন্তের প্রভাবে শুরু হওয়া দীর্ঘ ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে বাশার আল-আসাদের প্রধান মিত্র ছিল রাশিয়া। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ঝটিকা আক্রমণে আসাদ সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি রাশিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা কেবল সামরিক কোনো রদবদল নয়, বরং এটি ভূ-রাজনীতির এক নতুন সমীকরণ। আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো রুসলান ট্রাড উল্লেখ করেছেন, রাজনীতির চিরন্তন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে দামেস্ক ও মস্কো একে অপরের প্রয়োজনে পুরোনো তিক্ততা ঝেড়ে ফেলে নতুন করে পথ চলতে সম্মত হয়েছে। সিরিয়ার নতুন সরকারের তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির প্রয়োজনীয়তা এবং রাশিয়ার কাছে থাকা বিশাল ঋণের বিষয়টি এই আলোচনার পেছনে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাা ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছেন। তিনি দুইবার মস্কো সফর করেছেন এবং রাশিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, যা পশ্চিমা বিশ্বের চাপের মুখেও মস্কোর অবস্থানকে সংহত রেখেছে। অন্যদিকে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে রাশিয়ার জন্য সিরিয়ার ঘাঁটিগুলো অপরিহার্য। এই ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বলয় বজায় রাখার সুযোগ পাচ্ছে ক্রেমলিন।
তবে এই নতুন চুক্তির অর্থ এই নয় যে সিরিয়া কেবল রাশিয়ার ওপরই নির্ভরশীল থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দামেস্ক এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক এবং ইসরায়েলের সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নের নীতি গ্রহণ করেছে। রাশিয়ার উপস্থিতি বজায় রাখা সিরিয়ার জন্য অন্য শক্তিগুলোর সঙ্গে দরকষাকষির একটি বাড়তি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। সব মিলিয়ে, বাশার আল-আসাদের পতনের পর নতুন সিরিয়া এখন আর রাশিয়ার ক্লায়েন্ট নয়, বরং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার একজন সার্বভৌম নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।