বিশ্বকাপের দুর্গম যাতায়াত রুখতে কুড়িটি স্কুল বাস ভাড়া করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাচ্ছেন স্কটল্যান্ড সমর্থকরা

যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অনুষ্ঠেয় আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। বিশেষ করে স্কটল্যান্ডের সমর্থকরা অভিযোগ তুলেছেন, এবারের টুর্নামেন্টটি এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্গম ও ব্যয়বহুল আয়োজন হতে যাচ্ছে। আকাশচুম্বী টিকিটের দাম, হোটেল ভাড়া ও যাতায়াত খরচের ভারে জর্জরিত ভক্তরা এখন নিজেরাই অভিনব সমাধান বের করতে বাধ্য হচ্ছেন। স্কটল্যান্ড থেকে আসা প্রায় ১ হাজার সমর্থক নিজেরাই ২০টি স্কুলবাস ভাড়া করেছেন, যা তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে স্থানীয় প্রশাসনের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে প্রায় অর্ধেক খরচ সাশ্রয় করবে।
২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে বিনামূল্যে গণপরিবহন ব্যবহারের সুবিধা বা ‘কম্বি-টিকেটে’র মতো চমৎকার উদ্যোগের পর থেকে ফুটবলবিশ্ব এমন অভিজ্ঞতায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। রাশিয়া কিংবা কাতারেও দেখা গেছে বিশাল সব পরিবহণ সুবিধা। কিন্তু সেই রেশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েই ভক্তরা পড়েছেন বিপাকে। নিউ জার্সি বা ম্যাসাচুসেটসের মতো এলাকায় স্টেডিয়ামে যাতায়াতের জন্য এনএফএল ম্যাচের সাধারণ ভাড়ার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ গুণতে হচ্ছে তাদের। অনেক ক্ষেত্রেই যাতায়াত বাবদ ৮০ থেকে ৯৮ ডলারের বিশাল অংক গুনতে হচ্ছে দর্শকদের, যা বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার আয়োজনের মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লোজানের গবেষক ডেভিড গোগিশভিলি বলেন, ফিফার মতো সংস্থাগুলো বিশাল অংকের রাজস্ব আয়ের পরও আয়োজক শহরগুলোর ওপর খরচের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। অথচ অতীতে রাশিয়া বা কাতার এই ইভেন্টকে জনসম্পর্কের একটি মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে প্রচুর ভর্তুকি দিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলো এখন সেই দায় নিতে নারাজ। ফলে এই বিপুল ব্যয়ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ দর্শকদের পকেট থেকেই আদায় করা হচ্ছে। নিউ জার্সির গভর্নর মিকি শেরিল ইতিমধ্যে ফিফাকে এই বাড়তি পরিবহন খরচের দায়িত্ব নিতে আহ্বান জানিয়েছেন, যদিও ফিফা তাদের প্রাথমিক চুক্তির দোহাই দিয়ে দায় এড়িয়ে চলছে।
ফুটবলপ্রেমীদের এই ভোগান্তি কেবল যাতায়াত ভাড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণেও তারা চরম সংকটে পড়েছেন। বিশেষ করে স্টেডিয়াম এলাকাগুলোতে গাড়ি পার্কিংয়ের সীমিত সুযোগ এবং গণপরিবহনের উচ্চমূল্য দর্শকদের নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে। ব্রাজিলের এক অভিজ্ঞ সমর্থক ইনারা কোরেয়া দা কোস্তা জানান, নিউইয়র্ক থেকে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যাতায়াতের প্রাথমিক প্রস্তাবিত ভাড়া শুনে তিনি হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ভাড়া কিছুটা কমানো হলেও, তা এখনো সাধারণ দর্শকদের সামর্থ্যের বাইরে।
পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, অনেক ক্ষেত্রে বিদেশী সমর্থকরা নিজেদের মতো করে যাতায়াতের উপায় খুঁজছেন। স্কটিশ সমর্থকদের স্কুলবাস ভাড়া করে স্টেডিয়ামে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি সেই হতাশারই প্রতিফলন। তারা নিজেরাই পুলিশ প্রটেকশনসহ পরিবহনের ব্যবস্থা করে স্থানীয় প্রশাসনের চেয়ে প্রায় ৮৫ হাজার ডলার সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়েছেন। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই পরিকল্পনার এমন হযবরল দশা এবং দর্শকদের ওপর আর্থিক চাপ ফুটবলপ্রেমীদের মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তারা বলছেন, বিশ্বমঞ্চের উত্তেজনা উপভোগ করতে এসে আয়োজকদের মুনাফালোভী নীতির কারণে তাদের অভিজ্ঞতা চরম তিক্ততায় পর্যবসিত হচ্ছে।