সার্বিয়ায় রেল স্টেশনের ট্র্যাজেডি ঘিরে দানা বাঁধা ছাত্র আন্দোলন রূপ নিল সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে

সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ভালজেভো শহরে পুলিশি নির্যাতনের একটি ভিডিও ফুটেজ দেশটিতে চলমান ছাত্র আন্দোলনের এক ভয়াবহ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। গত বছরের ১৪ আগস্ট ধারণকৃত সেই ভিডিওতে দেখা যায়, রাস্তায় পড়ে থাকা এক ব্যক্তিকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য নির্মমভাবে প্রহার করছেন। নভি সাদ রেলওয়ে স্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন বর্তমানে প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচের এক দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একটি ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

নভেম্বর ২০২৪ সালে ঘটা রেলওয়ে স্টেশনের ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে তাদের সেই দাবি আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং বর্তমানে তারা সার্বিয়ার আমূল রাজনৈতিক পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ভুচিচের শাসনামলে শিক্ষার্থীদের এই জাগরণ দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা ও হতাশায় নিমজ্জিত জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

তবে এই গণআন্দোলন দমাতে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভালজেভোর সংবাদ পোর্টাল কোলুবারস্কে ডট আরএস-এর প্রধান সম্পাদক দারিয়া রানকোভিচ জানিয়েছেন, সরকারি মদদপুষ্ট গণমাধ্যমে তাকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করে নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে তিনি এবং তার সহকর্মীরা এখন রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিশানায় রয়েছেন, যা তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক বিরাট সংকট তৈরি করেছে।

এদিকে, সরকার দাবি করেছে যে প্রতিবাদকারীদের দমনে পুলিশের বলপ্রয়োগ ছিল আইনানুগ এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য তা প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় থাকা গুণ্ডাবাহিনীর সহিংস কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেছেন। বেলগ্রেডের লেখক তোমিস্লাভ মার্কোভিচ মনে করেন, ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির শাসনামলে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল, শিক্ষার্থীরা এখন তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে।

তবে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে উদ্বেগের সুরও শোনা যাচ্ছে। সমালোচকদের মতে, আন্দোলনের মধ্যে ক্রমশ জাতীয়তাবাদী স্লোগান ও উগ্র বক্তব্যের অনুপ্রবেশ ঘটছে, যা অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মী আইদা কোরোভিচ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শিক্ষার্থীরা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বিকল্প হলেও, তাদের বেড়ে ওঠার পেছনে থাকা জাতীয়তাবাদী প্রভাব থেকে তারা পুরোপুরি মুক্ত নয়।

বর্তমানে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর রূপান্তর নিয়ে নানামুখী বিতর্ক চলছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ভুচিচকে ক্ষমতা থেকে সরানোই এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য, তবে দীর্ঘমেয়াদে তারা কোন ধরনের সার্বিয়া গড়তে চায়, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসতে নারাজ এবং শুক্রবার ভালজেভোতে আন্দোলনের বার্ষিকী উপলক্ষে আবারও রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

০%
০%
০%
০%