দ্রুত শিল্পায়নের আগ্রাসনে হুমকির মুখে সীতাকুণ্ডের দ্বিতীয় সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্য

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া, মুরাদপুর ও সৈয়দপুর ইউনিয়নের উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় সাত হাজার একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে এক অনন্য ম্যানগ্রোভ বন। কেওড়া, বাইন ও গেওয়ার ঘন সবুজে ঘেরা এই বনে হরিণ, বানর, শৃগাল ও বুনো হাঁসসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখির অবাধ বিচরণ রয়েছে। স্থানীয়দের কাছে ‘দ্বিতীয় সুন্দরবন’ হিসেবে পরিচিত এই বনাঞ্চল জোয়ারের জলে ডুবে যায় এবং ভাটায় কাদামাটির পথ জেগে ওঠে, যা সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

দ্রুত শিল্পায়ন এবং মানুষের বাড়তি চাপের কারণে এই সবুজ বেষ্টনী ও এর জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এক সময় এই বনে গোপনে হরিণ শিকারের প্রবণতা থাকলেও বন বিভাগের নিয়মিত টহল এবং মামলার কারণে বর্তমানে শিকারিদের তৎপরতা কিছুটা কমেছে। সম্প্রতি বন্যপ্রাণী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট বিট কর্মকর্তাদের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং একজন শিকারিকে কারাভোগও করতে হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

তবে শুধু শিকার বন্ধ করলেই এই ম্যানগ্রোভ বন রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, বনভূমিতে অবৈধ প্রবেশ, গাছ কাটা, বর্জ্য ফেলা, দখল এবং বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের তীব্র চাপ রয়েছে। সীতাকুণ্ডের পাশাপাশি পাশের মিরসরাই উপজেলাতেও দ্রুত শিল্প জোনের পরিধি বাড়ছে, যার ফলে শিল্পায়নের বিস্তার এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ম্যানগ্রোভ বন কেবল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থলই নয়, বরং এটি উপকূলবাসীর জন্য একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক সুরক্ষা-কবচ হিসেবে কাজ করে। জলোচ্ছ্বাস ও ঢেউয়ের আঘাত থেকে উপকূলকে রক্ষা করতে এবং জীববৈচিত্র্যের প্রজননচক্র টিকিয়ে রাখতে এই বনের ভূমিকা অপরিসীম। বনের সঠিক সুরক্ষার জন্য নিয়মিত বৈজ্ঞানিক জরিপ পরিচালনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

শিল্পায়নের আগ্রাসনের মুখেও প্রকৃতির এই অনন্য আশ্রয়স্থল টিকিয়ে রাখতে হলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তারা দ্রুত অবৈধ দখল, গাছ কাটা, বর্জ্য ফেলা এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ বন্ধ করার জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের কার্যকর সমন্বয় না হলে উপকূলের এই সবুজ দেয়াল হারিয়ে গিয়ে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপদের আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

০%
০%
০%
০%