Advertisement

বামপন্থী ছাত্রনেতা থেকে রাষ্ট্রপ্রধান মির্জা ফখরুল ইসলামের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অভিযাত্রা

বামপন্থী ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা এবং পরবর্তীতে রাজপথের অগ্নিপুরুষ হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমা শেষে তিনি বঙ্গভবনের বাসিন্দা হলেন। গত ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, যেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করা মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন বৈচিত্র্যময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ার সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর তিনি রাজনীতি থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগদান করেন এবং ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সরকারি চাকরির অধ্যায় শেষ করেন।

বিজ্ঞাপন

১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তার জনপ্রতিনিধি জীবনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি বিএনপি সরকারের কৃষি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর, ২০১৬ সালে তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দলের হাল ধরেন।

দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির প্রধান মুখ হিসেবে তিনি অসংখ্য সরকারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জেরে তাকে ১১১টি মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে। বিএনপির কাছে এসব মামলাকে রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে অভিহিত করা হলেও, সরকারের পক্ষ থেকে একে আইনি প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখানো হয়েছিল। রাজপথের এই দীর্ঘ ও সংগ্রামী অধ্যায় তাকে দলের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

বিজ্ঞাপন

২০২৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে কয়েক মাস পরই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং তাকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনীত করা হয়। অতীতে যারা তার ওপর মামলা দায়ের করেছিল কিংবা যারা তাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করেছে, সেই কঠিন সময় পার করে তিনি আজ রাষ্ট্রপ্রধান।

এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলীয় পরিচয় ও অতীত রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। বামপন্থী ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, মন্ত্রী এবং সর্বশেষ বিরোধী দলীয় মহাসচিব—এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এখন বঙ্গভবনে। রাজপথের আন্দোলনের সেই মুখ এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক, যা তার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এবং নতুন যাত্রার শুরু।

সম্পর্কিত- রাষ্ট্রপতি
0%
0%
0%
0%